$৪,৪০০-এর নিচে সোনা, বাজারে বাড়ছে সতর্কতা
মার্কিন মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সোনার দামে বড় ওঠানামা
আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে ফের ওঠানামা শুরু হয়েছে। বুধবারের সর্বশেষ বাজারচিত্র অনুযায়ী, স্পট গোল্ডের দাম প্রতি আউন্সে প্রায় ৪,৩৮৭ ডলার, অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ ৪,৪০০ ডলারের স্তরের সামান্য নিচে রয়েছে। Reuters-এর বাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিন সোনার দাম প্রায় ০.৪৬ শতাংশ বেড়েছিল। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে, ফলে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্য এবং Federal Reserve-এর পরবর্তী সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।
সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দামে দ্রুত উত্থান দেখা গিয়েছিল। এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে হলুদ ধাতুর দাম দুই মাসের সর্বোচ্চ স্তর ছুঁয়ে ৪,৪০০ ডলারের উপরে উঠেছিল। পরে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তোলার প্রবণতা এবং মার্কিন ডলার ও বন্ডের বাজারে পরিবর্তনের কারণে দাম কিছুটা নেমে আসে। বাজার বিশ্লেষকদের কাছে ৪,৪০০ ডলারের স্তর তাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সীমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোনার দামের সাম্প্রতিক ওঠানামার অন্যতম বড় কারণ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি। সোনা নিজে কোনও সুদ দেয় না। ফলে যখন মার্কিন সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখন সুদ-প্রদানকারী সম্পদের তুলনায় সোনার আকর্ষণ কমতে পারে। বিপরীতে, সুদের হার কমার সম্ভাবনা বাড়লে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে। বর্তমানে মার্কিন মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য Federal Reserve-এর পরবর্তী নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক বাজারে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হরমুজ ঘিরে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত হামলার ঘটনাও বাজারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকছেন।
তবে অন্যদিকে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বুধবার Brent crude-এর দাম প্রায় ৮৯.৬০ ডলার প্রতি ব্যারেল এবং US crude প্রায় ৮৩.৯৪ ডলার ছিল। তেলের দাম বৃদ্ধি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সুদের হার কমানোর সিদ্ধান্ত আরও জটিল হতে পারে। এর ফলে সোনার বাজারেও বাড়তে পারে অস্থিরতা।
ভারতের বাজারেও আন্তর্জাতিক সোনার দামের এই ওঠানামার প্রভাব পড়ে। তবে ভারতীয় ক্রেতাদের জন্য আন্তর্জাতিক দামই একমাত্র নির্ধারক নয়। ডলার-রুপি বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক, স্থানীয় চাহিদা এবং দেশীয় বাজারের প্রিমিয়াম মিলিয়ে দেশে ২২ ক্যারেট ও ২৪ ক্যারেট সোনার দাম নির্ধারিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ৪,৪০০ ডলারের নিচে নামলেই ভারতীয় বাজারে একই অনুপাতে দাম কমবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বিশ্লেষকদের নজর এখন মূলত তিনটি বিষয়ে। প্রথমত, মার্কিন CPI ও মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান। দ্বিতীয়ত, Federal Reserve-এর পরবর্তী সুদের হার সংক্রান্ত ইঙ্গিত। তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণের ভবিষ্যৎ।
সব মিলিয়ে, ৪,৪০০ ডলারের নিচে সোনার অবস্থানকে বড় পতনের সংকেত হিসেবে দেখার চেয়ে বাজারের সাময়িক সংশোধন ও অনিশ্চয়তার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক দামের গতি দেখাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা একই সঙ্গে নিরাপদ সম্পদের চাহিদা এবং সুদের হার বৃদ্ধির ঝুঁকি, দুই বিষয়ই বিবেচনা করছেন।
সোনার দাম পরবর্তী সময়ে কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মার্কিন মূল্যস্ফীতি ও Federal Reserve-এর নীতির পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উপর। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে শুধু একটি দিনের আন্তর্জাতিক দাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঝুঁকি, সময়সীমা এবং দেশীয় বাজারের দাম বিবেচনা করা জরুরি।


