রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে নতুন হামলা
তাতারস্তানে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ১৩ নিহত, আহত ৭৮, লক্ষ্য রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে ফের বড় ধরনের ড্রোন হামলাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রাশিয়ার তাতারস্তান অঞ্চলের নিঝনেকামস্ক শহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন বলে রুশ আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে Associated Press জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলার পর তাতারস্তান প্রশাসন শোক ঘোষণা করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা চালানো হয়েছে।
নিঝনেকামস্ক তাতারস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি কেন্দ্র। শহরটি মস্কো থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য ছিল Tatneft-এর TANECO তেল শোধনাগার। হামলার পর ওই শিল্পাঞ্চলে আগুন লাগার খবরও সামনে আসে। রুশ কর্তৃপক্ষ হামলার কথা স্বীকার করলেও আক্রমণের সব লক্ষ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
এই হামলার তাৎপর্য শুধু হতাহতের সংখ্যায় নয়, বরং ভৌগোলিক দূরত্বেও। ইউক্রেনের সীমান্ত থেকে বহু দূরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল ও শিল্প পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে কিয়েভের দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। ইউক্রেনের বক্তব্য, রাশিয়ার জ্বালানি ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করাই তাদের কৌশলের অন্যতম উদ্দেশ্য। অন্যদিকে মস্কো এই ধরনের হামলাকে বেসামরিক পরিকাঠামোর উপর আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে তীব্র নিন্দা করেছে।
হামলায় বিদেশি নাগরিকদেরও প্রাণহানি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, উজবেকিস্তানের কাজানে অবস্থিত কনসুলেটের তথ্য অনুযায়ী নিহতদের মধ্যে সাতজন উজবেক নাগরিক ছিলেন। রাশিয়ায় বিপুল সংখ্যক মধ্য এশীয় শ্রমিক কাজ করেন। ফলে এই হামলার মানবিক প্রভাব রাশিয়া ও ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে মধ্য এশিয়াতেও পৌঁছেছে।
তাতারস্তানের এই হামলার পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের বিস্তৃত পরিসরেও সামরিক তৎপরতা বেড়েছে। ইউক্রেনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করার প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমনই রাশিয়াও ইউক্রেনের শহর, বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক হামলায় ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া ও অন্যান্য এলাকায় হতাহতের খবরও এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারের উপরও নজর রয়েছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলিকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা হলে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ ও পরিশোধন ক্ষমতার উপর চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব আঞ্চলিক বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহের ক্ষেত্রেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই রাশিয়ার অন্য একটি তেল শোধনাগার, Orsknefteorgsintez, ১১ আগস্ট ড্রোন হামলার পর কার্যক্রম বন্ধ করেছে বলে শিল্পসূত্রের বরাত দিয়ে Reuters জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে নিঝনেকামস্কের হামলা রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিক সামনে এনেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের সারি থেকে বহু দূরে রাশিয়ার গভীরে শিল্প ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা এখন কিয়েভের সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি যুদ্ধের মানবিক মূল্য আরও বাড়িয়ে তুলছে। শান্তি আলোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৎপরতা থাকলেও, পাল্টাপাল্টি হামলার এই ধারাবাহিকতা সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

