বাগরাকোটের লুপ ব্রিজ এত জনপ্রিয় কেন? সৌন্দর্যের মাঝেই লুকিয়ে পাহাড়ের কঠিন বাস্তবতা
বাগরাকোটের বিখ্যাত Loop Bridge ও NH-717A সিকিমের বিকল্প যোগাযোগপথ। ফাটল, ধস ও পাহাড়ি ঝুঁকি ঘিরে কেন প্রশ্ন উঠেছে, জানুন বিস্তারিত।
ডুয়ার্সের সবুজ জঙ্গল পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে উঠতেই বদলে যায় রাস্তার চরিত্র। একের পর এক বাঁক, গভীর খাদ, পাহাড়ের ঢালে ঘন জঙ্গল আর তার মাঝখানে কংক্রিটের বিশাল কাঠামো। উত্তরবঙ্গের বাগরাকোটের কাছে তৈরি হওয়া লুপ ব্রিজ এখন শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ নয়, সিকিমের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই চোখধাঁধানো সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে পাহাড়ি প্রকৃতির কঠিন বাস্তবতা।
বাগরাকোটের এই লুপ ব্রিজটি NH-717A-এর অংশ। রাস্তাটি বাগরাকোট থেকে কালিম্পং হয়ে সিকিমের রিশি সীমান্ত, রেনক, রোরাথাং, পাকিয়ং, রানিপুল হয়ে গ্যাংটকের দিকে সংযোগ তৈরি করছে। কেন্দ্রের অধীন NHIDCL-এর পরিকল্পনায় এই মহাসড়ককে NH-10-এর বিকল্প, সর্বকালীন যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
কারণ, উত্তরবঙ্গ থেকে সিকিম যাওয়ার প্রধান NH-10 বর্ষাকালে বারবার ধস, পাথর পড়া এবং ভূমিক্ষয়ের সমস্যায় আক্রান্ত হয়। ফলে বিকল্প রাস্তার প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। NH-717A সেই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই তৈরি হচ্ছে। তবে পাহাড়ে নতুন রাস্তা তৈরি করলেই যে প্রকৃতির ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়ে যায়, বাগরাকোটের ঘটনাই তার বড় উদাহরণ।
২০২৫ সালে লুপ ব্রিজের অ্যাপ্রোচ রোডে একাধিক ফাটল এবং rain cut দেখা যাওয়ার খবর সামনে আসে। ব্রিজের Chuikhim প্রান্তের কাছেও ফাটল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। একই সময়ে NH-717A-এর বিভিন্ন অংশে ধসের ঘটনাও সামনে আসে।
বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পায় যে ২০২৫ সালের মে মাসে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা NHIDCL আধিকারিকদের সঙ্গে লুপ ব্রিজ পরিদর্শন করেন। ব্রিজের structural damage, road design এবং slope stability নিয়ে পর্যালোচনার দাবি ওঠে। NHIDCL-এর তরফেও নকশা ও পাহাড়ের ঢালের স্থায়িত্ব খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছিল।
পাহাড়ি অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিই এই রাস্তার বড় চ্যালেঞ্জ। কালিম্পং-দার্জিলিং অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ এবং অতিবৃষ্টির কারণে ভূমিধসের ঝুঁকিও যথেষ্ট। ফলে রাস্তা যত আধুনিকই হোক, প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢাল ভেঙে পড়া কিংবা বড়সড় ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকেই যায়। ২০২৫ সালের আগস্টেও NH-717A-এর কাতারে এলাকায় ধসের কারণে যান চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
তবু এই রাস্তার গুরুত্ব শুধুমাত্র পর্যটন বা সাধারণ যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাগরাকোট থেকে সিকিমের দিকে নতুন এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে উত্তরবঙ্গ ও সিকিমের মধ্যে বিকল্প স্থলপথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কৌশলগত যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই করিডরের গুরুত্ব রয়েছে।
তাই লুপ ব্রিজকে শুধু ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বলে চিহ্নিত করার আগে বাস্তবতাটা বোঝা জরুরি। ব্রিজ বা রাস্তার কোনও অংশে সমস্যা দেখা দেওয়া মানেই গোটা প্রকল্প বিপজ্জনক, এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। আবার পাহাড়ের ঝুঁকিকে উপেক্ষা করাও যায় না। প্রকৌশলগত নিরাপত্তা, নিয়মিত পরিদর্শন, slope protection এবং দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণই এই রুটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সবুজ পাহাড়, মেঘের ভেলা আর অসাধারণ লুপের সৌন্দর্যের জন্য এই রাস্তা ইতিমধ্যেই মানুষের নজর কেড়েছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের সঙ্গে পাহাড়ের ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এই পথ শুধু একটি scenic route নয়, ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ করিডর।

