ভারতের যে রেল স্টেশনে একসময় টিকিট নয়, লাগত পাসপোর্ট-ভিসা!
পাঞ্জাবের Attari Railway Station ছিল ভারত-পাকিস্তান রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। Samjhauta Express, Passport-Visa ও ২০১৯-এর পর স্টেশন বন্ধের ইতিহাস জানুন।
ভারতের এমন এক রেল স্টেশন, যেখানে একসময় সাধারণ প্ল্যাটফর্ম টিকিট নয়, আন্তর্জাতিক যাত্রার জন্য প্রয়োজন হতো পাসপোর্ট ও ভিসা। জায়গাটি আর পাঁচটা স্টেশনের মতো নয়। কারণ, এই স্টেশন থেকেই একসময় সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে রেল যোগাযোগ ছিল। আজ সেই রেলপথ থমকে গেলেও ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে পাঞ্জাবের আটারি শাম সিং রেলওয়ে স্টেশন।
অমৃতসর জেলার আটারি এলাকায় অবস্থিত এই স্টেশনটি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি। সরকারি নথি অনুযায়ী, আটারি রেল স্টেশন ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইমিগ্রেশন পয়েন্ট ছিল এবং ওয়াঘা সীমান্ত থেকে এর দূরত্ব প্রায় কয়েক কিলোমিটার। আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের সময় এখানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো।
এই স্টেশনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে রয়েছে ‘সমঝৌতা এক্সপ্রেস’-এর ইতিহাস। ১৯৭৬ সালের ২২ জুলাই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর পর এই ট্রেন দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে নিরাপত্তাজনিত কারণে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস পরীক্ষা আটারিতে সম্পন্ন করা হতো। ফলে পাকিস্তানগামী যাত্রীদের জন্য পাসপোর্ট ও বৈধ ভিসা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি।
আটারির বিশেষত্ব এখানেই। সাধারণ ভারতীয় রেল স্টেশনে যেখানে প্ল্যাটফর্মে ঢোকার জন্য প্ল্যাটফর্ম টিকিটই যথেষ্ট, আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিষেবা চালু থাকার সময়ে আটারিতে প্রবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল কড়া নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন বিধি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত যাত্রীদের পাসপোর্ট ও ভিসা যাচাই করা হতো এবং অনুমতি ছাড়া প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।
সমঝৌতা এক্সপ্রেসের যাত্রাপথও ছিল দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারতীয় ভূখণ্ডে ট্রেনটি আটারি পর্যন্ত যেত এবং সীমান্ত পার হয়ে পাকিস্তানের ওয়াঘা হয়ে লাহোরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত। ২০০২ সালে সংসদে জঙ্গি হামলার পর একবার পরিষেবা বন্ধ হয়েছিল। পরে ২০০৪ সালে ফের চালু হয়। কিন্তু ২০১৯ সালে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের নতুন উত্তেজনার মধ্যে পরিষেবাটি আবার বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৯ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তান সমঝৌতা এক্সপ্রেসের পরিষেবা বন্ধ করে দেয়। সেই সময় ভারতীয় রেলকর্মীরা ওয়াঘা থেকে ট্রেনটি আটারি পর্যন্ত ফিরিয়ে আনেন। এরপর আর স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিষেবা ফিরে আসেনি। সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৯ সালের আগস্টের পর থেকে আটারি রেল ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশনে যাত্রী ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম আর চালু নেই।
আজ তাই আটারি স্টেশনের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে। আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল বন্ধ হলেও কৌশলগত অবস্থানের কারণে স্টেশনটি এখনও নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের কাছে অবস্থান হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারিও রয়েছে।
তবে আটারি শুধু একটি রেল স্টেশন নয়। এটি একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান বিভাজন, সীমান্ত রাজনীতি এবং দুই দেশের মানুষের যোগাযোগের ইতিহাসের সাক্ষী। একসময় যে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে সমঝৌতার বার্তা বহন করত ট্রেন, আজ সেই একই জায়গা দাঁড়িয়ে রয়েছে নীরব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।

