পশ্চিমবঙ্গের রেল পরিকাঠামোয় নতুন করে গতি আনার উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বা অপেক্ষমাণ একাধিক রেল প্রকল্পকে ফের সক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। রেলওয়ে বোর্ডের সিদ্ধান্তের পর রাজ্যে মোট ১৭টি প্রকল্প নিয়ে সমীক্ষা, ডিটেইলড প্রজেক্ট রিপোর্ট (DPR) এবং পরবর্তী বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ হয়েছে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে।
এই তালিকায় রয়েছে বীরভূমের প্রান্তিক-সিউড়ি, পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি-এগ্রা ও নন্দকুমার-বলাইপান্ডার মতো প্রকল্প। উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ-ডালখোলা, রায়গঞ্জ-ইটাহার, গাজোল-ইটাহার এবং ইটাহার-বুনিয়াদপুরের মতো সংযোগও রয়েছে তালিকায়।
কেন ফের সামনে ১৭টি প্রকল্প?
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু রেল প্রকল্প বিভিন্ন কারণে থমকে ছিল। জমি অধিগ্রহণের সমস্যা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দেরি, অর্থনৈতিক বিষয় এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ট্রাফিক না থাকার মতো কারণ প্রকল্পগুলির অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেলওয়ে বোর্ডের তরফে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একাধিক প্রকল্প ফের সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। জনচাহিদা ও প্রকল্পগুলির সম্ভাব্য গুরুত্বও এই পুনর্বিবেচনার ক্ষেত্রে বিবেচনায় এসেছে।
কোন কোন প্রকল্প রয়েছে?
পুনরুজ্জীবনের তালিকায় উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে—
- প্রান্তিক-সিউড়ি — প্রায় ৩৪ কিলোমিটার
- বনগাঁ-পোড়ামহেশতলা — প্রায় ২০ কিলোমিটার
- বনগাঁ-চাঁদবাজার — প্রায় ১২ কিলোমিটার
- চাঁদবাজার-বাগদা — প্রায় ১৪ কিলোমিটার
- রানাঘাট (আড়ংঘাটা)-দত্তফুলিয়া — প্রায় ৮ কিলোমিটার
- কাঁথি-এগ্রা — প্রায় ২৬ কিলোমিটার
- নন্দকুমার-বলাইপান্ডা — প্রায় ২৮ কিলোমিটার
- নন্দীগ্রাম-কান্দিয়ামারি (নয়াচর) — প্রায় ৭ কিলোমিটার
- বওয়াইচণ্ডী-আরামবাগ — প্রায় ৩১ কিলোমিটার
- বওয়াইচণ্ডী-খানা — প্রায় ২৪ কিলোমিটার
- ব্যাঙ্কুরা (কালাবতী)-পুরুলিয়া হয়ে হুড়া — প্রায় ৬৫ কিলোমিটার
- রায়গঞ্জ-ইটাহার — প্রায় ২২ কিলোমিটার
- গাজোল-ইটাহার — প্রায় ২৭ কিলোমিটার
- ইটাহার-বুনিয়াদপুর — প্রায় ২৭ কিলোমিটার
- চালসা-নকশালবাড়ি
- রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তী — প্রায় ১৫ কিলোমিটার
- রায়গঞ্জ-ডালখোলা — প্রায় ৪৩ কিলোমিটার
প্রান্তিক-সিউড়ি লাইনে নজর কেন?
বীরভূমের প্রান্তিক ও সিউড়ির মধ্যে প্রস্তাবিত নতুন রেল সংযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্প ফের সক্রিয় হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
এই লাইন বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিকের সঙ্গে সিউড়ির সরাসরি রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি বোলপুর-শান্তিনিকেতন ও বীরভূমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও তীর্থস্থানের যোগাযোগেও ভবিষ্যতে সুবিধা হতে পারে।
উত্তরবঙ্গেও বাড়তে পারে রেল যোগাযোগ
রায়গঞ্জ-ডালখোলা, রায়গঞ্জ-ইটাহার, গাজোল-ইটাহার এবং ইটাহার-বুনিয়াদপুরের মতো প্রকল্পগুলি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার রেল যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
নতুন রেললাইন তৈরি হলে যাত্রী পরিবহণের পাশাপাশি কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণেও সুবিধা হতে পারে। তবে এই সম্ভাব্য সুবিধা বাস্তবে কার্যকর হবে প্রকল্পগুলি নির্মাণের পরেই।
১৭টি প্রকল্প মানেই কি সঙ্গে সঙ্গে ট্রেন চলবে?
না। প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত হওয়া এবং ট্রেন চলাচল শুরু হওয়া এক বিষয় নয়।
প্রকল্পভেদে সমীক্ষা, DPR, অনুমোদন, জমি অধিগ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ এবং নির্মাণের মতো একাধিক ধাপ রয়েছে। তাই রেলওয়ে বোর্ডের পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা গেলেও, সব প্রকল্পের নির্মাণকাজ অবিলম্বে শুরু হয়ে যাচ্ছে এমনটা বলা ঠিক হবে না।
বাংলায় রেলের বড় বিনিয়োগ
এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই একাধিক বড় রেল প্রকল্প বিভিন্ন পর্যায়ে চলছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে চলমান রেল প্রকল্পগুলির মূল্য প্রায় ৯৮,৪৯৯ কোটি টাকা। একই সময়ে জমি অধিগ্রহণের সমস্যা একাধিক প্রকল্পের অগ্রগতিতে বাধা হয়ে রয়েছে বলেও জানানো হয়েছিল।
ফলে ১৭টি প্রকল্পের পুনরুজ্জীবন বাংলার রেল পরিকাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, আসল নজর এখন বাস্তব অগ্রগতির দিকে।
সমীক্ষা ও DPR থেকে জমি অধিগ্রহণ, অর্থ বরাদ্দ থেকে নির্মাণকাজ, প্রতিটি ধাপ কত দ্রুত এগোয়, তার উপরই নির্ভর করবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান কতটা দ্রুত হয়।

