শ্রাবণী মেলায় এবার নতুন চমক, তারকেশ্বরে প্রথমবার চন্দননগরের আলোর সাজ

NEWS INDIA বাংলা
0
Tarakeswar Sravani Mela Chandannagar lighting Taraknath Temple West Bengal



পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলাকে ঘিরে এ বছর বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি মহলের দাবি। লক্ষাধিক শিবভক্তের সমাগমের কথা মাথায় রেখে মন্দির চত্বর, সংযোগকারী রাস্তা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তুতির অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে প্রথমবার চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকসজ্জা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।


সরকারি সূত্রের দাবি, এবার শ্রাবণী মেলাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আলোকসজ্জার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনী এবং সৌন্দর্যায়নের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ভক্তদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও এবারের মেলা বাড়তি আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।



শ্রাবণী মেলাকে ঘিরে বিশেষ প্রস্তুতি

তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলা বহু দশক ধরে বাংলার অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত। শ্রাবণ মাসজুড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত পদযাত্রা করে তারকেশ্বর মন্দিরে পৌঁছে বাবা তারকনাথের মাথায় জল অর্পণ করেন।


এই বিপুল জনসমাগমকে মাথায় রেখেই প্রশাসনের তরফে অবকাঠামো, নিরাপত্তা, আলো এবং সৌন্দর্যায়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য।



চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের হাতে সাজছে মেলার রূপ

এবারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল, চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের তৈরি আলোকসজ্জা দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ এবং সংযোগকারী রাস্তা সাজানো হচ্ছে।


চন্দননগরের আলোকসজ্জা শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের বিভিন্ন উৎসবেও বিশেষ পরিচিত। সেই অভিজ্ঞতাকেই এবার তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলায় কাজে লাগানো হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।


শিল্পীদের একাংশের বক্তব্য, জগদ্ধাত্রী পুজোর পরে সাধারণত বড় কাজের সুযোগ কম থাকে। ফলে শ্রাবণী মেলার এই প্রকল্প তাঁদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে।



কোন কোন এলাকায় থাকছে আলোর সাজ?

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৈদ্যবাটি নিমাই তীর্থ ঘাট থেকে তারকেশ্বর মন্দির পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, বিভিন্ন স্থানে এলইডি আলোর গেট, শিবলিঙ্গ, ত্রিশূল, ডমরু এবং মন্দিরের আদলে বিশেষ নকশা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাস্তার দু'ধার এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথেও আলোকসজ্জা থাকবে।


এছাড়াও মন্দির চত্বরকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বিশেষ আলোক পরিকল্পনার পাশাপাশি লেজার শোর ব্যবস্থাও করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।



শিল্পীদের বক্তব্যে আশাবাদের সুর

চন্দননগরের একাধিক আলোকশিল্পী এই প্রকল্পকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।


শিল্পী জয়ন্ত দাস বলেন, সরকার চন্দননগরের আলোকশিল্পকে বড় ধর্মীয় উৎসবে গুরুত্ব দেওয়ায় তাঁরা উৎসাহিত হয়েছেন। তাঁর আশা, ভবিষ্যতেও রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে এই শিল্পের আরও বেশি ব্যবহার হবে।


অন্যদিকে আলোকশিল্পী মনোজ সাহা জানান, তাঁর দায়িত্বে থাকা অংশে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা আলোকসজ্জার মাধ্যমে সাজানো হচ্ছে। বিভিন্ন নকশার এলইডি গেট এবং ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।


আরেক শিল্পী দীপক সাউ জানান, ত্রিশূল, ডমরু এবং কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের আদলে একাধিক আলোকসজ্জার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। অধিকাংশ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।



পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও বাড়তি প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সৌন্দর্যায়ন শুধু ভক্তদের অভিজ্ঞতাই উন্নত করে না, স্থানীয় ব্যবসা, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।


হোটেল, লজ, পরিবহণ, খাবারের দোকান, ফুল ব্যবসা এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়ের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।


চন্দননগরের আলোকশিল্পীদের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থানের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



আরও শিল্পীদের সুযোগ দেওয়ার দাবি

যদিও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অধিকাংশ শিল্পী, তাঁদের একাংশের দাবি, বরাত পাওয়া শিল্পীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত।


তাঁদের মতে, ভবিষ্যতে যদি আলোকসজ্জার কাজ সংশ্লিষ্ট শিল্পী সংগঠন বা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়, তাহলে আরও বেশি শিল্পী কাজের সুযোগ পাবেন এবং ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের পরিসরও আরও বিস্তৃত হবে।



কেন গুরুত্বপূর্ণ এই উদ্যোগ?

তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি বড় অংশ। প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতির কারণে নিরাপত্তা, আলোকসজ্জা, যোগাযোগ এবং জনপরিষেবার উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী আলোকশিল্পকে এই মেলার সঙ্গে যুক্ত করার ফলে একদিকে যেমন বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে, তেমনই স্থানীয় শিল্পীদের জন্য নতুন বাজারও তৈরি হতে পারে।



দর্শনার্থীদের জন্য কী জানা জরুরি?

শ্রাবণী মেলার সময় ভিড় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যাত্রার আগে প্রশাসনের জারি করা ট্রাফিক নির্দেশিকা, নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরামর্শ এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখে নেওয়া উচিত।


বিশেষ করে পদযাত্রী এবং দূরদূরান্ত থেকে আগত ভক্তদের জন্য নির্ধারিত রুট, বিশ্রাম কেন্দ্র এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার তথ্য আগেভাগে জেনে নিলে যাত্রা আরও সহজ হবে।



আগামী দিনের সম্ভাবনা

সরকারি উদ্যোগ এবং শিল্পীদের অংশগ্রহণ সফল হলে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের আরও বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে চন্দননগরের আলোকসজ্জার ব্যবহার বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।


এবারের শ্রাবণী মেলায় এই নতুন উদ্যোগ কতটা দর্শকদের মন জয় করতে পারে এবং স্থানীয় শিল্পীদের জন্য কতটা দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!