পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়তে চলেছে সংসদের উচ্চকক্ষেও। রাজ্যসভার তিনটি আসনে বিজেপি প্রার্থীদের জয় প্রায় নিশ্চিত হওয়ায় দলটির সাংসদ সংখ্যা আরও বাড়তে চলেছে। এর ফলে উচ্চকক্ষে বিজেপির অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হবে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।
এই তিনটি আসন বিজেপির ঝুলিতে গেলে শুধু দলের নিজস্ব সাংসদ সংখ্যাই বাড়বে না, এনডিএ জোটও গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গ থেকে কারা হচ্ছেন রাজ্যসভার প্রার্থী?
রাজ্যসভার পশ্চিমবঙ্গের তিনটি আসনের জন্য বিজেপির পক্ষ থেকে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন—
সুস্মিতা দেব
প্রকাশচিক বরাইক
সুখেন্দুশেখর রায়
বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ অনুযায়ী, তিন প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
বিজেপির সাংসদ সংখ্যা কত হবে?
তিনজন সদস্য নির্বাচিত হলে রাজ্যসভায় বিজেপির মোট সাংসদ সংখ্যা বেড়ে ১১৭-এ পৌঁছবে। এটি উচ্চকক্ষে দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বের অন্যতম নজির হতে পারে।
একই সঙ্গে এনডিএ জোটের মোট শক্তিও বেড়ে ১৫২-এ পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে কতটা দূরে?
রাজ্যসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১২৩ জন সদস্যের সমর্থন।
যদি বিজেপির সদস্য সংখ্যা ১১৭-এ পৌঁছায়, তাহলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য দলটির আরও মাত্র ৬ জন সাংসদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ভবিষ্যতে সংসদীয় কৌশল নির্ধারণে বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
সাধারণ বিল পাসে কী সুবিধা মিলবে?
এনডিএর সম্ভাব্য ১৫২ সদস্যের সমর্থন সাধারণ আইন বা Ordinary Bill পাস করানোর ক্ষেত্রে সরকারকে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে।
ফলে সংসদের উচ্চকক্ষে আইন প্রণয়নের সময় সমর্থন জোগাড় করা আগের তুলনায় সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সংবিধান সংশোধনী বিল এখনও বড় চ্যালেঞ্জ
তবে সাধারণ বিলের তুলনায় সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করা অনেক বেশি কঠিন।
কারণ এই ধরনের বিল পাস করাতে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হয়। রাজ্যসভার সব সদস্য উপস্থিত থাকলে সেই সংখ্যা প্রায় ১৬৬-এ পৌঁছায়।
ফলে বিজেপি ও এনডিএকে এখনও অন্যান্য দলের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হতে পারে।
কোন কোন দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রে কয়েকটি আঞ্চলিক দলের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াইএসআর কংগ্রেস
রাজ্যসভায় দলটির ৪ জন সদস্য রয়েছেন। নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে কেন্দ্রকে সমর্থন করার সম্ভাবনার কথা রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়।
ডিএমকে
ডিএমকের ৮ জন সদস্য রয়েছেন। বিলভেদে দলটির অবস্থান রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজু জনতা দল (বিজেডি)
রাজ্যসভায় বিজেডির ৫ জন সদস্য আছেন। অতীতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলটি স্বাধীন অবস্থান নিয়েছে।
নির্দল সদস্য ও ছোট দল
নির্দল সাংসদ পরিমল নাথওয়ানি এবং কয়েকটি ছোট আঞ্চলিক দলের অবস্থানও নির্দিষ্ট বিলের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
ভবিষ্যতে কোন বিলগুলিতে নজর?
রাজনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে, আগামী দিনে কেন্দ্র সরকার সীমানা পুনর্বিন্যাস (Delimitation), মহিলা সংরক্ষণ কার্যকরীকরণ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদে আনতে পারে।
এই ধরনের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে বিজেপির নিজস্ব সংখ্যার পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সমর্থন বা ভোটদানে বিরত থাকার সিদ্ধান্তও বড় ভূমিকা নিতে পারে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপির সম্ভাব্য তিনটি অতিরিক্ত রাজ্যসভা আসন শুধুমাত্র সাংসদ সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়। এটি সংসদের উচ্চকক্ষে দলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, আইন প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের ক্ষেত্রে এখনও অন্যান্য দলের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। ফলে আগামী দিনে রাজ্যসভার রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের।

