মিড-ডে মিলে নিরামিষ মেনু বিতর্ক, ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে হাই কোর্টে PIL

NEWS INDIA বাংলা
0


Mid Day Meal ISKCON Calcutta High Court PIL West Bengal school nutrition


কলকাতা পুর এলাকার সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব একটি বেসরকারি ধর্মীয় সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের ঘোষণার পর এবার সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা এবং প্রভাব নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের হয়েছে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL)। মামলায় প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তে নিরামিষ মেনু চালু করা হচ্ছে এবং কী ভিত্তিতে এই দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।


আদালত সূত্রে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, আগামী মঙ্গলবার মামলাটির শুনানি হতে পারে। ফলে বিষয়টি এখন বিচারাধীন হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের পর্যবেক্ষণের উপরই নির্ভর করবে।


কী ঘোষণা করেছিল রাজ্য সরকার?

চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশের পর সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কলকাতা পুর এলাকার মিড-ডে মিল প্রকল্পে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে বৃহৎ পরিসরে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা।


সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই ইসকন মিড-ডে মিল প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কলকাতা পুর এলাকার জন্য এই সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।


মেনুতে কী কী খাবার রাখার পরিকল্পনা?

ইসকনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন খাদ্যতালিকায় শিশুদের পুষ্টির চাহিদার কথা মাথায় রেখে উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ নিরামিষ খাবার রাখা হবে। প্রস্তাবিত মেনুতে সয়াবিন, রাজমা, পনির-সহ বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।


সংস্থার দাবি, শুধুমাত্র নিরামিষ হওয়াই লক্ষ্য নয়; বরং নির্ধারিত পুষ্টিমান বজায় রেখে স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন করাই মূল উদ্দেশ্য।


জনস্বার্থ মামলায় কী কী প্রশ্ন উঠেছে?

মামলাকারীর মূল অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থার ফলে ছাত্রছাত্রীরা প্রাণিজ উৎসের প্রোটিন থেকে বঞ্চিত হতে পারে। তাঁর বক্তব্য, বহু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে মিড-ডে মিলই দিনের অন্যতম প্রধান পুষ্টিকর খাবার। তাই খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনার আগে শিশু পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল।


এছাড়াও আবেদনে দাবি করা হয়েছে, এতদিন মিড-ডে মিলের রান্না ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বহু স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলা এই সিদ্ধান্তের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ হারাতে পারেন। ফলে সরকারের সিদ্ধান্তের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও আদালতের নজরে আনার আবেদন জানানো হয়েছে।


আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন মামলাকারী। একটি ধর্মীয় পরিচয়সম্পন্ন সংস্থাকে সরকারি প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা খতিয়ে দেখার আর্জিও জানানো হয়েছে।


মিড-ডে মিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য কী?

ভারতের অন্যতম বৃহৎ স্কুলভিত্তিক পুষ্টি কর্মসূচি হল মিড-ডে মিল প্রকল্প। বর্তমানে এটি 'পিএম পোষণ' (PM POSHAN) প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হল সরকারি ও সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির মান উন্নত করা, অপুষ্টি কমানো এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বৃদ্ধি করা।


প্রতিটি রাজ্য কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা অনুসরণ করে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করতে পারে। কোথাও ডিম, কোথাও দুধ, কোথাও মাছ বা অন্যান্য প্রোটিনের উৎস অন্তর্ভুক্ত থাকে। আবার কিছু রাজ্যে নিরামিষ মেনুও অনুসরণ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট পুষ্টিমান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।


পুষ্টি নিয়ে কী বলছে বিশেষজ্ঞদের সাধারণ মত?

পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী, শিশুদের সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, খনিজ এবং ফ্যাটের ভারসাম্য প্রয়োজন। প্রাণিজ প্রোটিনের পাশাপাশি সয়াবিন, ডাল, রাজমা, পনিরের মতো নিরামিষ উৎস থেকেও প্রয়োজনীয় প্রোটিন পাওয়া সম্ভব। তবে খাদ্যতালিকা কতটা সুষম হবে, তা নির্ভর করে মোট পুষ্টিগুণের উপর।


এই মামলায় এখনও আদালতের সামনে কোনও বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত উপস্থাপিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরকারি ভাবে কিছু জানা যায়নি।


কর্মসংস্থান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন

মিড-ডে মিল প্রকল্পের সঙ্গে বহু বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠী যুক্ত। অভিযোগ উঠেছে, নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হলে এই গোষ্ঠীগুলির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।


যদিও সরকার এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত অবস্থান প্রকাশ করেনি। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে, তা আদালতের শুনানির সময় স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।


আদালতের সামনে কোন বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুনানির সময় আদালত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে পারে—


ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নীতিগত ভিত্তি।

খাদ্যতালিকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও পুষ্টিগত মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের উপর সম্ভাব্য প্রভাব।

সরকারি সিদ্ধান্তে সংবিধানের সমতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।

তবে এগুলি আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণের বিষয় এবং শুনানির পরেই এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানা যাবে।


এখন কী হতে পারে?

মামলাটি বিচারাধীন হওয়ায় সরকারের সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে আদালতের নির্দেশের উপর নির্ভর করছে। আগামী মঙ্গলবার সম্ভাব্য শুনানিতে আদালত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারে অথবা পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করতে পারে।


অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত মামলার বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। ফলে আদালতের শুনানি এবং সরকারি অবস্থানের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল, শিক্ষা মহল এবং অভিভাবকদের একাংশের।


মিড-ডে মিল শুধুমাত্র একটি খাদ্য প্রকল্প নয়, বরং লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সামাজিক কর্মসূচি। তাই এই প্রকল্পে যে কোনও নীতিগত পরিবর্তন ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে, তার উত্তর মিলবে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের পরেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!