দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটক ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু হতেই নজিরবিহীন সাড়া মিলেছে। সরকারি তথ্য ও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পরিষেবা শুরুর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ১ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি ভিসা আবেদন জমা পড়েছে। এই বিপুল সাড়া শুধু পর্যটনের ক্ষেত্রেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের চিকিৎসা পরিষেবা এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজমের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা বহু মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য চিকিৎসা। ভাষাগত সুবিধা, তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা এবং ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে কলকাতা বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের রোগীদের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য।
কেন কলকাতা এখনও বাংলাদেশি রোগীদের প্রথম পছন্দ?
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কলকাতায় পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বহু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বাংলা ভাষায় চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক পরিকাঠামো এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধাও রোগীদের আকৃষ্ট করে।
চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর পরিবারের সদস্যদের থাকার ব্যবস্থা, পরিবহণ এবং ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্যও কলকাতাকে আলাদা সুবিধা দেয়। ফলে হৃদরোগ, ক্যানসার, নিউরোলজি, অর্থোপেডিকস, শিশু চিকিৎসা ও জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য বহু বাংলাদেশি প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গে আসেন।
রাজ্যের মেডিক্যাল ট্যুরিজমে নতুন সম্ভাবনা
রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বাজেটেও মেডিক্যাল ট্যুরিজমকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দফতরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ, ভুটান এবং মায়ানমার-সহ প্রতিবেশী দেশগুলির রোগীদের উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দিতে আরও বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেলে অত্যাধুনিক সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তোলার দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শুধু স্বাস্থ্য পরিষেবাই নয়, হোটেল, পরিবহণ, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবা ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বাড়তে পারে।
বেসরকারি হাসপাতালগুলিও দেখছে ইতিবাচক সম্ভাবনা
কলকাতার একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল মনে করছে, পর্যটক ভিসা পুনরায় চালু হওয়ার ফলে বিদেশি রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরতে পারে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে কলকাতার চিকিৎসকদের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থা রয়েছে। উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
দুই বছর পর কেন বাড়ল আবেদন?
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ভারত পর্যটক ভিসা পরিষেবা স্থগিত রেখেছিল। তবে সীমিত পরিসরে মেডিক্যাল ভিসা চালু ছিল। সম্প্রতি পর্যটক ভিসা পুনরায় চালু হওয়ার পর দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় থাকা বহু আবেদনকারী একসঙ্গে আবেদন করেন। সেই কারণেই প্রথম দিনেই বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশনও জানিয়েছে, আবেদনের ব্যাপক চাহিদার কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে ভিসা পরিষেবা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মেডিক্যাল ট্যুরিজম পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
স্বাস্থ্য অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিক্যাল ট্যুরিজম শুধু হাসপাতালের আয় বাড়ায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে—
হোটেল ও অতিথিশালা
পরিবহণ পরিষেবা
ওষুধ ও ফার্মেসি
ডায়াগনস্টিক সেন্টার
রেস্তোরাঁ ও খুচরো ব্যবসা
মেডিক্যাল ট্রাভেল পরিষেবা
ফলে বিদেশি রোগীর সংখ্যা বাড়লে তার ইতিবাচক প্রভাব রাজ্যের সামগ্রিক পরিষেবা খাতেও পড়ে।
আবেদনকারীদের জন্য কী জানা জরুরি?
পর্যটক ভিসা চালু হলেও ভিসা প্রদান সম্পূর্ণভাবে ভারত সরকারের নির্ধারিত নিয়ম, নথি যাচাই এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। আবেদন করলেই ভিসা নিশ্চিত হবে—এমন নয়। প্রত্যেক আবেদন পৃথকভাবে যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সামনে কী হতে পারে?
পর্যটক ভিসা পুনরায় চালু হওয়ার পর যে বিপুল সাড়া মিলেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে চিকিৎসা, ব্যবসা এবং পারিবারিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের, বিশেষ করে কলকাতার গুরুত্ব এখনও অটুট। আগামী কয়েক মাসে ভিসা পরিষেবা আরও স্বাভাবিক হলে পশ্চিমবঙ্গে মেডিক্যাল ট্যুরিজমের গতি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ। যদিও প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে ভিসা অনুমোদনের হার, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর।

