ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (DAC) প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও অস্ত্র কেনার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। সরকারি সূত্রের দাবি, এই প্যাকেজে সেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার জন্য একাধিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ও নজরদারি ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কামিকাজে ড্রোন, গাইডেড মিসাইল, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম এবং উচ্চ-উচ্চতায় নজরদারির জন্য বিশেষ প্ল্যাটফর্ম।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের পরিবর্তিত বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর সীমান্তে চিন এবং পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহে জোর বাড়িয়েছে নয়াদিল্লি।
৫২ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা প্রকল্পে কী কী থাকছে?
ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিলের অনুমোদিত তালিকায় একাধিক আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—
কামিকাজে বা লয়টারিং মিউনিশন ড্রোন
ম্যান-পোর্টেবল অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল
মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল
অ্যান্টি-ড্রোন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ‘আকাশ তরঙ্গ’
সামুদ্রিক নজরদারির জন্য আনম্যানড এয়ারিয়াল সিস্টেম
মাল্টি-ইনফ্লুয়েন্স গ্রাউন্ড মাইন
বৈদ্যুতিক প্রপালশন প্রযুক্তির পরীক্ষাকেন্দ্র
বায়ুসেনার জন্য ফিক্সড-উইং হাই-অল্টিটিউড সিউডো স্যাটেলাইট (HAPS)
সরকারি সূত্রের দাবি, এই সরঞ্জামগুলির বড় অংশ দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন নীতিও আরও এগিয়ে যাবে।
কামিকাজে ড্রোন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে কামিকাজে ড্রোন বা লয়টারিং মিউনিশনকে অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধরনের ড্রোন নির্দিষ্ট এলাকার উপর দীর্ঘ সময় চক্কর কাটতে পারে এবং লক্ষ্য শনাক্ত হওয়ার পর সরাসরি আঘাত হানে। আক্রমণের সময় ড্রোনটি নিজেই বিস্ফোরিত হয়, তাই একে 'কামিকাজে ড্রোন' বলা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তুলনামূলকভাবে কম খরচে উচ্চমূল্যের সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সক্ষমতার কারণে বহু দেশ এখন এই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করছে।
ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীতেও এই প্রযুক্তি যুক্ত হলে সীমান্ত এলাকায় দ্রুত ও নির্ভুল হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ।
অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তিতেও বাড়ছে জোর
শুধু আক্রমণাত্মক অস্ত্র নয়, শত্রুপক্ষের ড্রোন মোকাবিলায়ও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া 'আকাশ তরঙ্গ' ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম শত্রুপক্ষের চালকবিহীন বিমান শনাক্ত, ট্র্যাক এবং প্রয়োজনে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলিতে ড্রোন হামলার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বহু দেশ অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি সীমান্ত নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।
নৌসেনা ও বায়ুসেনার জন্যও বড় বরাদ্দ
ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল শুধু স্থলবাহিনীর জন্য নয়, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার আধুনিকীকরণেও একাধিক প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে।
নৌসেনার জন্য মাল্টি-ইনফ্লুয়েন্স গ্রাউন্ড মাইন, শিপবোর্ন আনম্যানড এয়ারিয়াল সিস্টেম এবং বৈদ্যুতিক প্রপালশন প্রযুক্তির পরীক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য উচ্চ-উচ্চতায় দীর্ঘ সময় নজরদারি চালাতে সক্ষম ফিক্সড-উইং হাই-অল্টিটিউড সিউডো স্যাটেলাইট সংগ্রহের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তি সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা নজরদারি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে প্রতিরক্ষা মহলের ধারণা।
'আত্মনির্ভর ভারত' নীতিতে আরও জোর
গত কয়েক বছরে কেন্দ্র সরকার প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতিতেও দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি বজায় রাখা হয়েছে।
এর ফলে শুধু আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহই নয়, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে বলে সরকারের আশা।
অপারেশন 'সিঁদুর'-এর পর আরও সতর্কতা
সরকারি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক অপারেশন 'সিঁদুর'-এর পর ভারতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে। সীমান্তে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের বাস্তবতা বিবেচনা করে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে অপারেশন সম্পর্কিত বিভিন্ন সামরিক সাফল্যের যে পরিসংখ্যান বিভিন্ন মহলে প্রচারিত হয়েছে, সেগুলির সবকটির স্বাধীন সরকারি যাচাই সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। ফলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এবং সরকারি তথ্যকেই এই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান সময়ে যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রচলিত ট্যাঙ্ক, কামান বা যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি এখন ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার যুদ্ধ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে শুধু সেনাসংখ্যা নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন অস্ত্র ও নজরদারি প্রযুক্তি যুক্ত হলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানানোর গতি, নির্ভুলতা এবং সীমান্ত পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা আরও উন্নত হবে।
সামনে কী?
ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিলের অনুমোদনের পর এবার বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য আনুষ্ঠানিক দরপত্র, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর ধাপে ধাপে এই অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ভারতীয় সেনা, নৌসেনা এবং বায়ুসেনার হাতে পৌঁছাবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। সেই লক্ষ্যেই ৫২ হাজার কোটি টাকার এই প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিকল্পনা ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

