ভারতে পেট্রলে ইথানল মিশ্রণের নীতি (E20 Fuel) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পথে কেন্দ্র সরকার এগোচ্ছে। আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের উপর নির্ভরতা কমানো, দূষণ হ্রাস এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক একটি জনমত সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই নীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এনডিএ সমর্থকদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে।
সি-ভোটারের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উত্তরদাতা ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহারে আগ্রহী নন। বিশেষ করে গাড়ির মাইলেজ, ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা এবং জ্বালানির দামের মতো বিষয় নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ সামনে এসেছে। ফলে কেন্দ্রের উচ্চাভিলাষী ইথানল কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ই-২০ পেট্রল কী? কেন গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্র?
ই-২০ বা E20 Fuel বলতে এমন পেট্রলকে বোঝায়, যেখানে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রল মিশ্রিত থাকে।
ইথানল মূলত আখ, ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য থেকে উৎপাদিত জৈব জ্বালানি। কেন্দ্র সরকারের দাবি, এই জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রয়োজন কমবে, পরিবেশ দূষণও হ্রাস পাবে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের নতুন বাজার তৈরি হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিও উপকৃত হতে পারে।
এই লক্ষ্যেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে ই-২০ জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে এবং নতুন মডেলের বহু গাড়িকেও E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করছে বিভিন্ন সংস্থা।
সমীক্ষায় কী উঠে এসেছে?
সি-ভোটারের প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, ই-২০ পেট্রল ব্যবহার নিয়ে এখনও উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষের মধ্যে অনীহা রয়েছে।
সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এনডিএ সমর্থকদের মধ্যে প্রায় ৫২.৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ই-২০ পেট্রল ব্যবহার করতে আগ্রহী নন। অন্যদিকে ১৮.১ শতাংশ এই জ্বালানি ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। বাকি ২৯.৫ শতাংশ এখনও এ বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট মত প্রকাশ করেননি।
একই সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, সামগ্রিকভাবে উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫২ শতাংশ পেট্রলে ইথানল মেশানোর বর্তমান নীতিকে সমর্থন করেন না। প্রায় ২২ শতাংশ এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন, আর বাকিরা নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন।
তবে উল্লেখ করা জরুরি, এটি একটি জনমত সমীক্ষার ফলাফল। সমীক্ষার নমুনা, পদ্ধতি এবং উত্তরদাতাদের ভিত্তিতে ফলাফল পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এটিকে সরকারি অবস্থান বা চূড়ান্ত জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত নয়।
আপত্তির মূল কারণ কী?
সমীক্ষা এবং বিভিন্ন গ্রাহকের প্রতিক্রিয়া থেকে কয়েকটি উদ্বেগ বারবার সামনে এসেছে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হল, ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ব্যবহারে গাড়ির মাইলেজ কিছুটা কমে যেতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে ইঞ্জিনের উপর কোনও প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও অনেকের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ইথানলের শক্তি ঘনত্ব (Energy Density) পেট্রলের তুলনায় কিছুটা কম। সেই কারণে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে গাড়ির প্রযুক্তি, ইঞ্জিনের নকশা এবং প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্দেশিকার উপর।
নীতীন গড়করি কী বলেছেন?
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতীন গড়করি ইথানল নিয়ে ওঠা উদ্বেগের জবাব দিতে গিয়ে বলেন, তাঁর জানা মতে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি ব্যবহারের কারণে কোনও গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
কেন্দ্রের বক্তব্য, বর্তমানে বাজারে আসা অধিকাংশ নতুন যানবাহন ধীরে ধীরে E20-সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করা হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এই জ্বালানি ব্যবহারে প্রযুক্তিগত সমস্যা আরও কমে আসবে বলে সরকারের আশা।
মাইলেজ কমার বিষয়টি কী বলছে সরকার?
সরকারও স্বীকার করেছে যে কিছু ক্ষেত্রে E20 জ্বালানি ব্যবহারে মাইলেজ সামান্য কমতে পারে।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের পূর্ববর্তী ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু গাড়িতে ই-২০ ব্যবহারের ফলে প্রায় ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি দক্ষতার পার্থক্য দেখা যেতে পারে। তবে এই পরিবর্তন সব গাড়ির ক্ষেত্রে একই রকম হবে না।
অন্যদিকে আধুনিক Flex-Fuel বা E20-Compatible গাড়িগুলিকে এই ধরনের জ্বালানির কথা মাথায় রেখেই ডিজাইন করা হচ্ছে।
ইথানল মিশ্রিত পেট্রলের দাম কি কম হবে?
অনেকের ধারণা, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি মানেই কম দাম। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ই-২০ জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নয়, ইথানলের উৎপাদন ব্যয় এবং সংগ্রহমূল্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইথানল এমন দামে সংগ্রহ করা হয় যাতে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও ইথানলের মূল্য বেশি থাকলে জ্বালানির খুচরো দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।
কেন ইথানলের উপর জোর দিচ্ছে কেন্দ্র?
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন বড় আলোচনার বিষয়। আন্তর্জাতিক সংঘাত, অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা এবং আমদানির উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই ভারত বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।
এর পাশাপাশি ইথানল উৎপাদনের মাধ্যমে আখ, ভুট্টা ও অন্যান্য কৃষিজ ফসলের অতিরিক্ত বাজার তৈরি হওয়ায় কৃষকরাও উপকৃত হতে পারেন বলে কেন্দ্রের দাবি। পরিবেশ দূষণ কমানো এবং কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যও এই কর্মসূচির অন্যতম ভিত্তি।
ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে ইথানল কর্মসূচি?
ভারতে ধাপে ধাপে ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি Flex-Fuel প্রযুক্তির গাড়ির সংখ্যাও বাড়ছে। তবে সাধারণ গ্রাহকদের আস্থা অর্জন, গাড়ির প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা এবং বাস্তব ব্যবহারে যে প্রশ্নগুলি উঠছে, সেগুলির স্বচ্ছ উত্তর দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ই-২০ নীতি নিয়ে সমর্থন ও সংশয়—দুই ধরনের মতই সামনে আসছে। আগামী দিনে সরকারি নীতি, অটোমোবাইল শিল্পের প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং ব্যবহারকারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই এই কর্মসূচির সাফল্য অনেকটাই নির্ধারিত হবে।

