কলকাতা মেট্রোর জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডর নির্মাণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্পর্শ করল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বহু প্রতীক্ষিত এই মেট্রো প্রকল্পে সুড়ঙ্গ খননের দায়িত্বে থাকা টানেল বোরিং মেশিন (TBM) ‘দুর্গা’ সফলভাবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মেট্রো স্টেশন এলাকায় পৌঁছেছে। এর ফলে শহরের অন্যতম জটিল ভূগর্ভস্থ অংশে কাজ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
মেট্রো রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার থেকেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় টানেল সংক্রান্ত পরবর্তী পর্যায়ের প্রযুক্তিগত কাজ শুরু হবে। প্রকল্পের অগ্রগতির নিরিখে এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা।
ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত পৌঁছনো কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো প্রকল্পের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অংশগুলির অন্যতম হল শহরের ঘনবসতিপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী এলাকার নীচ দিয়ে নিরাপদে সুড়ঙ্গ নির্মাণ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, পার্ক স্ট্রিট এবং খিদিরপুর সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে ব্যস্ত নগর পরিকাঠামো।
এই পরিস্থিতিতে টানেল বোরিং মেশিনের নির্ভুল গতিপথ বজায় রেখে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে চলা প্রকৌশলগত দিক থেকে বড় সাফল্য বলেই মনে করা হচ্ছে।
মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ভূগর্ভস্থ খননের সময় উপরের রাস্তা, ভবন কিংবা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার উপর প্রভাব কমিয়ে আনার দিকেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
জোকা-এসপ্ল্যানেড প্রকল্পে কাজ করছে দুটি অত্যাধুনিক TBM
বর্তমানে এই করিডরে সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজে নিয়োজিত রয়েছে দুটি অত্যাধুনিক টানেল বোরিং মেশিন—‘দুর্গা’ এবং ‘দিব্যা’।
দুটি যন্ত্রই খিদিরপুর থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত প্রায় ২.৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যুগ্ম টানেল নির্মাণের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই টানেল ভবিষ্যতে জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো পরিষেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, 'দুর্গা' বর্তমানে পার্ক স্ট্রিটের দিকের সুড়ঙ্গ খননের দায়িত্বে রয়েছে। অন্যদিকে 'দিব্যা' বিপরীতমুখী লাইনের কাজ করছে।
কেমন এই টানেল বোরিং মেশিন?
নতুন প্রজন্মের এই টিবিএমগুলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত। প্রতিটি মেশিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৫ মিটার এবং ওজন প্রায় ৬০০ টন। এগুলি বিশেষভাবে ভারতের ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তৈরি করা হয়েছে।
মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই যন্ত্রগুলি প্রতি মিনিটে গড়ে প্রায় ৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত সুড়ঙ্গ খনন করতে সক্ষম। একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, চাপ পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এবং বিশেষ সিলিং সিস্টেমের মাধ্যমে নিরাপদে কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের প্রকৌশল পদ্ধতি।
কোন কোন আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে?
মেট্রো রেলের তথ্য অনুযায়ী, TBM-গুলিতে একাধিক নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সংযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ইনফ্লেটেবল সিল প্রযুক্তি
প্রেসার ট্রান্সডিউসার
টেল স্কিন গ্রিস (TSG) সিস্টেম
ব্যাকআপ TSG পাম্প
রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা
স্বয়ংক্রিয় খনন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি
এই ব্যবস্থাগুলির সাহায্যে ভূগর্ভস্থ মাটির চাপ, জলস্তর এবং বিভিন্ন ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। ফলে নিরাপত্তার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে।
কত গভীরে চলছে সুড়ঙ্গ নির্মাণ?
প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, খিদিরপুর অঞ্চল থেকে প্রায় ১৭ মিটার গভীরে এই সুড়ঙ্গ খননের কাজ চলছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তা, বহুতল ভবন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নীচ দিয়ে এই কাজ সম্পূর্ণ হওয়ায় প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
প্রকৌশলীদের মতে, ভূগর্ভস্থ চাপ এবং মাটির প্রকৃতি অনুযায়ী প্রতিটি অংশে আলাদা পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়।
কবে শেষ হতে পারে কাজ?
মেট্রো রেলের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী—
'দুর্গা'-র সুড়ঙ্গ খননের কাজ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে 'দিব্যা'-র ব্রেকথ্রু বা চূড়ান্ত সংযোগ ২০২৭ সালের মার্চ মাসে সম্পন্ন হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পের অগ্রগতি আবহাওয়া, ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি এবং প্রযুক্তিগত প্রয়োজনের উপর নির্ভর করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে।
জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডর চালু হলে কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের সঙ্গে শহরের কেন্দ্রস্থলের যোগাযোগ আরও দ্রুত ও সহজ হবে। দীর্ঘদিন ধরে যানজটের সমস্যায় ভোগা বহু যাত্রীর জন্য এটি উল্লেখযোগ্য স্বস্তি এনে দিতে পারে।
বিশেষ করে জোকা, ঠাকুরপুকুর, বেহালা, খিদিরপুর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং এসপ্ল্যানেডের মধ্যে যাতায়াতের সময় অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমলে পরিবেশ দূষণ এবং জ্বালানির ব্যবহারও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে বলে নগর পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মত।
নগর পরিকাঠামোয় নতুন অধ্যায়
কলকাতা ভারতের প্রথম মেট্রো শহর। সেই শহরেই একের পর এক নতুন করিডর নির্মাণের মাধ্যমে গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার চেষ্টা চলছে। জোকা-এসপ্ল্যানেড প্রকল্প তারই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্টেশন পর্যন্ত TBM 'দুর্গা'-র পৌঁছে যাওয়া শুধু একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয়, বরং বহু প্রতীক্ষিত মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আগামী কয়েক মাসে সুড়ঙ্গ নির্মাণের অগ্রগতি এবং নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখতে পারলেই এই করিডরের কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে আশা করছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ।

