অযোধ্যার রাম মন্দির শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের প্রতীক। সেই মন্দিরের অনুদান তহবিল নিয়েই এবার উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকার নগদ অনুদান ও মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নিয়ে বিতর্কের আবহে সামনে এসেছে ছয় বছর পুরনো একটি অডিট রিপোর্ট, যেখানে আগেই আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিক গুরুতর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয়েছিল ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র’ ট্রাস্ট। মন্দির নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই ট্রাস্টের কাছে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত নগদ অর্থ, সোনা, রূপো, হিরে এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী দান করেছেন। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই অনুদানের পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।
কিন্তু অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের যথাযথ নথিভুক্তিকরণ এবং তদারকির ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। সম্প্রতি অনুদানের অর্থ এবং মূল্যবান সামগ্রীর হিসাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সেই পুরনো অডিট রিপোর্ট আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
সূত্রের দাবি, ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে একটি বেসরকারি অডিট সংস্থা ট্রাস্টের আর্থিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে অনুদানের অর্থ সংগ্রহ, হিসাব সংরক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং সম্পদের রেকর্ড রাখার ক্ষেত্রে আরও সুসংহত ও আধুনিক পদ্ধতি চালু করা জরুরি। বিশেষ করে নগদ অর্থ এবং মূল্যবান সামগ্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছিল, আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি ধাপে একাধিক স্তরের যাচাই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কারণ, শুধুমাত্র একক স্তরের রেকর্ড বা অনুমোদনের উপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে তথ্যগত বিভ্রান্তি কিংবা অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অডিট সংস্থা তথ্য সংরক্ষণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল বলে জানা যাচ্ছে।
বর্তমানে যে অভিযোগগুলি সামনে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হল কিছু অনুদান এবং মূল্যবান সামগ্রী যথাযথভাবে মূল নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে, তবুও অডিট রিপোর্টের পুরনো সতর্কবার্তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই।
ইতিমধ্যেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছে। তদন্তকারীরা অনুদান গ্রহণ, সংরক্ষণ, হিসাবরক্ষণ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছেন। প্রাথমিক তদন্তে কিছু প্রশাসনিক ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার ইঙ্গিত মিলেছে বলেও সূত্রের খবর।
অডিট রিপোর্টে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। বিপুল কর্মীসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব বণ্টন, তদারকি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব যাচাই, তথ্য সংরক্ষণ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিপুল পরিমাণ অনুদান আসে বলেই আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তদের বিশ্বাস অটুট রাখতে প্রতিটি অনুদানের সঠিক হিসাব রাখা এবং নিয়মিত অডিট পরিচালনা করা প্রয়োজন। তা না হলে ছোটখাটো প্রশাসনিক ত্রুটিও পরবর্তীকালে বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
এদিকে তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছে রাজনৈতিক মহলও। বিরোধী দলগুলির একাংশ ইতিমধ্যেই পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। অন্যদিকে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাম মন্দিরকে ঘিরে ওঠা এই বিতর্ক শুধু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ নয়, বরং একটি বৃহৎ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন সকলের নজর তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকে। কারণ, সেই রিপোর্টই স্পষ্ট করবে অভিযোগের বাস্তবতা কতটা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

