নিজের মাথার উপর একটি পাকা ছাদ—এই স্বপ্ন নিয়েই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় আবেদন করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। কিন্তু নিয়মের জটিলতায় অনেক সময় প্রকৃত উপভোক্তারাও প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। এবার সেই সমস্যার সমাধানে নতুন উদ্যোগের কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (গ্রামীণ)-এর কিছু নিয়ম শিথিল করা এবং পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিশেষ কোটা ব্যবস্থার দাবি নিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে নবান্ন।
যদি এই আলোচনা ইতিবাচক ফল দেয়, তাহলে আগামী দিনে আরও বেশি সংখ্যক দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবার আবাস প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
কেন উঠছে নিয়ম বদলের দাবি?
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের নিজস্ব পাকা বাড়ি নেই বা বসবাসের উপযুক্ত স্থায়ী ঘর নেই, তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় আর্থিক সহায়তা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হন।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু পরিবার দীর্ঘদিন কাঁচা বা মাটির ঘরে বসবাস করলেও বৃষ্টি, ঝড় কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে সামান্য অ্যাসবেস্টস বা করোগেটেড শিটের ছাদ ব্যবহার করেছেন। ফলে সরকারি যাচাইয়ে তাঁদের অনেককেই ‘পাকা বাড়ির মালিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ পড়তে হচ্ছে।
রাজ্যের প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, শুধু একটি তুলনামূলক মজবুত ছাদ থাকার কারণে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে প্রকল্পের বাইরে রাখা উচিত নয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সেই ঘর বসবাসের জন্য এখনও সম্পূর্ণ নিরাপদ বা স্থায়ী নয়।
কী চাইছে রাজ্য?
নবান্নের তরফে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই বিষয়টি তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে বলে সূত্রের খবর। রাজ্য চাইছে, যোগ্য উপভোক্তাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন করা হোক।
একজন প্রশাসনিক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক পরিবার অত্যন্ত কষ্ট করে নিজেদের ঘরের ছাদ কিছুটা শক্তপোক্ত করেছেন। কিন্তু সেই সামান্য উন্নতির জন্য যদি তাঁরা সরকারি আবাসনের সুযোগ হারান, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে।
সেই কারণেই যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা আনার পক্ষে সওয়াল করছে রাজ্য প্রশাসন।
পুরনো তালিকা পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ
ইতিমধ্যেই আবাস যোজনার পুরনো উপভোক্তা তালিকা পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে। গত কয়েক বছরে যাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন, তাঁদের তথ্য নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ায় একদিকে যেমন অযোগ্যদের নাম বাদ যেতে পারে, অন্যদিকে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আবাস যোজনায় আসতে পারে ‘কোটা সিস্টেম’?
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সম্ভাব্য ‘কোটা ব্যবস্থা’ নিয়ে। সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিটি রাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক উপভোক্তার বরাদ্দ নির্ধারণ করতে পারে।
অর্থাৎ একটি আর্থিক বছরে পশ্চিমবঙ্গে কতজন মানুষ আবাস প্রকল্পের অর্থ পাবেন, তার একটি নির্দিষ্ট সীমা বা কোটা নির্ধারণ করা হতে পারে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটা ব্যবস্থা চালু হলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আরও সুসংগঠিত হতে পারে। তবে একইসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যাতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলি বঞ্চিত না হন।
কেন্দ্রের বড় আর্থিক অনুমোদন
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-গ্রামীণের আওতায় একাধিক রাজ্যের জন্য ১০,০০০ কোটিরও বেশি টাকার অনুমোদন দিয়েছেন। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ১২টি রাজ্যের জন্য এই অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা করা হয়েছে।
যদিও সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ ছিল না, তবুও আবাস প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য আলোচনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল।
কী হতে পারে আগামী দিনে?
এখনও পর্যন্ত নিয়ম পরিবর্তন বা কোটা ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে রাজ্যের পক্ষ থেকে যে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট। ফলে আগামী দিনে কেন্দ্র ও রাজ্যের আলোচনার ফলাফলের উপরই নির্ভর করবে আবাস যোজনার নতুন রূপরেখা।
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরাপদ ও স্থায়ী বাসস্থানের আশায় অপেক্ষা করছেন, তাঁদের জন্য এই সম্ভাব্য পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

