কেন পশ্চিমমুখী নর্মদা? ভারতের ‘উল্টো নদী’র পেছনে কোটি বছরের ভূ-তাত্ত্বিক রহস্য
ভারতের অধিকাংশ নদী পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। এর প্রধান কারণ, ভারতীয় উপদ্বীপের ভূপ্রকৃতিগত ঢাল মূলত পূর্বমুখী। কিন্তু এই স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম হয়ে আজও পশ্চিমমুখী প্রবাহে আরব সাগরের দিকে ছুটে চলেছে নর্মদা নদী। তাই একে অনেকেই ‘উল্টো নদী’ বলেও অভিহিত করেন।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে কোটি কোটি বছর আগের এক ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ইতিহাস। হিমালয় গঠনের সময় ভারতীয় ভূখণ্ডে ব্যাপক চাপ ও টান সৃষ্টি হয়। সেই প্রক্রিয়ায় বিন্ধ্য পর্বতমালা এবং সাতপুরা পর্বতমালা-র মাঝের অংশ ধীরে ধীরে বসে গিয়ে একটি বিশাল রিফ্ট ভ্যালি বা গ্রস্ত উপত্যকার সৃষ্টি হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এই উপত্যকার ঢাল পূর্ব দিকে নয়, পশ্চিম দিকে ছিল। ফলে সেই স্বাভাবিক ঢাল অনুসরণ করেই নর্মদা পশ্চিমমুখী প্রবাহে যাত্রা শুরু করে।
নর্মদার উৎস মধ্যপ্রদেশের অমরকণ্টক মালভূমিতে। সেখান থেকে প্রায় ১,৩১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে নদীটি মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খাম্বাত উপসাগর-এ মিলিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত আরব সাগরে পতিত হয়।
নর্মদা একা নয়। তাপ্তী নদী-ও একই ধরনের রিফ্ট ভ্যালির মধ্যে দিয়ে পশ্চিমমুখী প্রবাহিত হয়। এছাড়া মাহি, সবরমতী ও লুনির মতো কয়েকটি নদীও পশ্চিমে প্রবাহিত হলেও নর্মদার ভূ-তাত্ত্বিক গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
শুধু ভূতাত্ত্বিক দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও নর্মদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্দার সরোবর বাঁধ এবং ইন্দিরা সাগর প্রকল্প-এর মতো বৃহৎ জলপ্রকল্প লক্ষ লক্ষ মানুষের পানীয় জল, সেচ ও শিল্পের প্রয়োজন মেটায়।
ধর্মীয় বিশ্বাসেও নর্মদার বিশেষ স্থান রয়েছে। সনাতন ধর্মে নর্মদাকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। এছাড়া ভেড়াঘাট-এর মার্বেল পাথরের গিরিখাত এবং বিখ্যাত ধুঁয়াধর জলপ্রপাত নর্মদার সৌন্দর্যকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম এবং প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয়েই নর্মদা আজ ভারতের অন্যতম বিস্ময়কর নদী হিসেবে পরিচিত।

