পশ্চিমবঙ্গ দিবসের আবহে কলকাতার এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম পরিবর্তনকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। শহরের অন্যতম পরিচিত সড়ক সোরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের নতুন প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে একদিকে যেমন ঐতিহাসিক সংশোধন বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
রবিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আনেন। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিনে গৃহীত এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং অতীতের কিছু বিতর্কিত স্মৃতির পুনর্মূল্যায়নের অংশ।
পার্ক সার্কাস অঞ্চলের অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ হিসেবে পরিচিত এই রাস্তা বহু বছর ধরেই শহরের যান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট ক্রসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন।
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার নাম ছিল সোরাবর্দি অ্যাভিনিউ। ইতিহাস অনুযায়ী, এই নামকরণ করা হয়েছিল বিশিষ্ট চিকিৎসক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য স্যার হাসান সোরাবর্দির স্মৃতিতে। ১৯৩০-এর দশকে তৎকালীন কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট এই নামকরণ করেছিল। তবে বর্তমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তে সেই নামের পরিবর্তে নতুন পরিচয় পেল রাস্তা।
কে ছিলেন গোপাল মুখার্জি?
ইতিহাসে যাঁকে অধিকাংশ মানুষ ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে চেনেন, তাঁর প্রকৃত নাম ছিল গোপাল মুখার্জি। কলকাতার বউবাজার এলাকায় বসবাসকারী এই ব্যক্তি ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় আলোচনায় আসেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে যে, সেই অশান্ত সময় কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়ের একাংশের আত্মরক্ষার সংগঠনে তাঁর ভূমিকার কথা উঠে আসে। সমর্থকদের মতে, তিনি দাঙ্গার সময় আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এই কারণেই বর্তমান প্রশাসন তাঁর অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে রাস্তার নামকরণে তাঁর নাম বেছে নিয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।
শনিবার প্রথমবার সরকারি উদ্যোগে পালিত পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘিরে রাজ্যজুড়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। তারকেশ্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বাংলার ইতিহাস, দেশভাগের প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের বিভিন্ন ঘটনাবলির উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাও তুলে ধরেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের আবহেই কলকাতার এই গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
রাস্তার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন শাসকদলের একাধিক নেতা ও সমর্থকরা। তাঁদের দাবি, বাংলার ইতিহাসে যাঁদের অবদান দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি, তাঁদের স্মরণ করার সময় এসেছে।
অন্যদিকে, ইতিহাসবিদ ও নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করছেন, যে কোনও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনা জরুরি। কারণ রাস্তার নাম কেবল একটি পরিচয় নয়, তা শহরের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ।
সোরাবর্দি অ্যাভিনিউ থেকে গোপাল মুখার্জি রোড—এই নাম পরিবর্তন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলার ইতিহাস, রাজনীতি এবং স্মৃতিচর্চা নিয়ে নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
আগামী দিনে এই পরিবর্তন কতটা জনসমর্থন পায় এবং শহরের নাগরিকদের কাছে কীভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের।

