হিমালয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়! নেপাল-চিন সীমান্তে মৃত ১,০০৩, নিখোঁজ ৪,৪০০-র বেশি
এক সপ্তাহেই বদলে গেল হিমালয়ের ছবি, নেপাল-চিন সীমান্তে মৃতের সংখ্যা পেরোল ১,০০০
নেপাল-চিন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। ১ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নেপালে ৯৮৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। চিনের তিব্বত অঞ্চলে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুই দেশের হিসাব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১,০০৩। একই সঙ্গে নেপাল ও তিব্বতে এখনও ৪,৪০০-র বেশি মানুষ নিখোঁজ। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত ২৬ আগস্ট। হিমালয়ের উচ্চভূমিতে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে বিপুল বরফ, পাথর, কাদা ও জল নীচের নদী উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসে। তার জেরে সৃষ্টি হয় প্রবল বন্যা ও ধস। নেপালের একাধিক এলাকা এবং চিনের তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় এখনও বহু দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারীদের পৌঁছতে সমস্যা হচ্ছে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) জানিয়েছে, দেশটিতে ৩,৯১৬ জন এখনও নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। অন্যদিকে চিনের তিব্বত অঞ্চলে ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি। অর্থাৎ নিখোঁজদের একটি বড় অংশ এখনও বিভিন্ন দেশের নাগরিক।
উদ্ধার অভিযানের অন্যতম বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি (Hydropower Projects)। নেপালের বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত বহু মানুষ নিখোঁজ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৬৩৯ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাদা, পাথর ও জল ঢুকে যাওয়ায় সেই সুড়ঙ্গগুলিতে পৌঁছনো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এখনও পর্যন্ত নেপালে ১১,৮০০-র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের কাছে খাবার, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে হেলিকপ্টার ও অন্যান্য বিমান ব্যবহার করা হচ্ছে। নেপালের পাশাপাশি চিন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ এবং উদ্ধারকারী দলও ত্রাণ ও অনুসন্ধান অভিযানে সহযোগিতা করছে। নেপাল ইতিমধ্যেই ৯,২০০-র বেশি কর্মীকে উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার কাজে মোতায়েন করেছে।
এই বিপর্যয় ঘিরে জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) প্রভাব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির দিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের একাংশও হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং উষ্ণায়নের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক করছেন। তবে নির্দিষ্ট এই বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা কতটা, তা নিশ্চিত করতে আরও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বর্তমানে উদ্ধারকারীদের প্রধান লক্ষ্য নিখোঁজদের সন্ধান এবং দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা মানুষদের কাছে পৌঁছনো। কিন্তু পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদা-পাথরের স্তূপ, ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা এবং নতুন ধসের আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে ক্রমাগত কঠিন করে তুলছে। ফলে নেপাল-চিন সীমান্তের এই হিমালয় বিপর্যয় এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং হাজার হাজার মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এক গভীর মানবিক সংকট।


