যাদবপুরে ফের দেওয়াল দখল, মুছে দেওয়া গ্রাফিতির জায়গায় রবীন্দ্রনাথ-ভগৎ সিং-প্রীতিলতা
সাদা রং করা দেওয়াল ফের রঙিন, যাদবপুরে রবীন্দ্রনাথ থেকে ভগৎ সিং—‘Reclaim the Wall’ ঘিরে নতুন বিতর্ক
কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে (Jadavpur University) দেওয়াল লিখন ও গ্রাফিতি ঘিরে ফের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সাদা রং করে মুছে দেওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক গ্রাফিতির জায়গায় ফের ছবি, কবিতার লাইন এবং প্রতিবাদী স্লোগান লিখেছেন পড়ুয়াদের একাংশ। ‘Reclaim the Wall’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালকে মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি উঠেছে। অন্যদিকে, প্রশাসন এবং বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলির বক্তব্যে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সোমবার বিকেল থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দেওয়ালে ফের শুরু হয় গ্রাফিতি ও দেওয়াল লিখন। পড়ুয়াদের আঁকা ছবিতে উঠে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভগৎ সিং, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং সর্দার উধম সিংয়ের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি লেখা হয় ‘Long Live Resistance’ এবং ‘Free Palestine’-এর মতো রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংহতির বার্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের কাছেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতির সঙ্গে তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতার অংশ লেখা হয়েছে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে থাকা কয়েকটি ‘আপত্তিকর’ গ্রাফিতি মুছে ফেলার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য বক্তব্যের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কয়েকটি দেওয়ালে সাদা রং করে দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে। এরপরই পড়ুয়াদের একাংশ ফের দেওয়াল লেখার কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁদের বক্তব্য, যাদবপুরের দীর্ঘ ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে দেওয়াল লিখন ও গ্রাফিতি গভীরভাবে যুক্ত। ফলে দেওয়াল মুছে দেওয়া মানে শুধু লেখা সরানো নয়, ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যবাহী মতপ্রকাশের একটি মাধ্যমকে সীমিত করা বলেই তাঁদের দাবি।
তবে প্রশাসনের অবস্থান আলাদা। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও এমন কোনও লেখা বা ছবি থাকা উচিত নয়, যা অন্যের ভাবাবেগে আঘাত করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যাদবপুরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনের সংস্কৃতি থাকলেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে আপত্তিকর গ্রাফিতিকে উৎসাহ দেন না। বিতর্কিত বা আপত্তিকর লেখাগুলি চিহ্নিত করার জন্য একটি কমিটি গঠনের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে, ক্যাম্পাসে ‘Free Palestine’ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগান লেখার বিরোধিতা করেছে ABVP। সংগঠনটির বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালকে রাজনৈতিক প্রচারের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। ফলে বিতর্কটি এখন কেবল দেওয়াল পরিষ্কার রাখা বা পুনরায় লেখার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়াল লিখনের ইতিহাস অবশ্য দীর্ঘদিনের। ছাত্র আন্দোলন, সামাজিক প্রতিবাদ, সাহিত্য ও রাজনৈতিক বক্তব্য—বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসের দেওয়ালে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। সেই ঐতিহ্যের জায়গা থেকেই পড়ুয়াদের একাংশ দেওয়ালকে নিজেদের বক্তব্য জানানোর মাধ্যম হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের যুক্তি এবং পড়ুয়াদের মতপ্রকাশের অধিকারের দাবির মধ্যে সংঘাতই নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে আপত্তিকর বক্তব্য সরানোর দাবি, অন্যদিকে দেওয়ালকে মুক্ত মতপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা—দুই অবস্থানের টানাপোড়েনে যাদবপুরের দেওয়াল ফের রাজনৈতিক আলোচনার দৃশ্যমান মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেওয়াল লিখন নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং পড়ুয়াদের ‘Reclaim the Wall’ কর্মসূচি কোন পথে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। পাশাপাশি, ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ব্যবহারের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


