সোনায় নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়ছে, ভূরাজনীতি ও সুদের হারেই নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দিশা
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে ফের বিনিয়োগকারীদের নজরের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সোনা (Gold)। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালী ঘিরে ঝুঁকি, মার্কিন ডলারের গতিপথ এবং Federal Reserve-এর সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা, সব মিলিয়ে মূল্যবান ধাতুটির বাজারে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক উত্থানের পর লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে। ফলে আগামী দিনে সোনার দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে একাধিক আন্তর্জাতিক সূচকের উপর।
রয়টার্সের ১৪ আগস্টের বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুক্রবার স্পট গোল্ডের দাম প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্সে ৪,৩৭৯.৯৫ ডলারে পৌঁছয়। এর আগের সেশনে লাভ তুলে নেওয়ার কারণে দাম ১.৩ শতাংশ কমেছিল। একই সময়ে মার্কিন ডলার কিছুটা দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ডলারে নির্ধারিত সোনা তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। মার্কিন অর্থনৈতিক তথ্যও আগামী মাসে ফেডের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা কমিয়েছে।
সোনার বাজারে ভূরাজনীতির প্রভাবও এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। আবার সেই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সুদের হার নিয়ে সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে। ফলে সোনার বাজারে ভূরাজনীতি ও মুদ্রানীতির প্রভাব পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
সুদের হারের সমীকরণ সোনার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সোনা নিজে কোনও সুদ দেয় না। তাই সুদের হার কমার সম্ভাবনা বাড়লে সুদ-দেওয়া সম্পদের তুলনায় সোনার আকর্ষণ বাড়তে পারে। বিপরীতে, শক্তিশালী ডলার এবং বেশি বন্ড-ইল্ড সাধারণত সোনার উপর চাপ তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দুর্বলতা এবং ফেডের নীতিতে তুলনামূলক নরম অবস্থানের প্রত্যাশা সোনার বাজারকে সমর্থন করেছে।
তবে সোনার চাহিদার গল্প শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঘিরে নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলিও গত কয়েক মাসে সোনা কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সোনা কেনা ২৮৯ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের জন্য রেকর্ড। আনুমানিক মূল্য ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার। World Gold Council-এর সমীক্ষায় ৪৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী ১২ মাসে নিজেদের সোনার মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।
ভারতের বাজারেও আন্তর্জাতিক সোনার দাম, ডলার-রুপি বিনিময় হার এবং দেশীয় চাহিদার প্রভাব পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এবং একই সঙ্গে টাকা দুর্বল হলে দেশে সোনার দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে উচ্চ দাম সাধারণ ক্রেতার চাহিদায় চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার উত্থান থাকলেও দেশীয় বাজারে বিনিয়োগ ও গয়নার চাহিদার গতিপথ এক নাও হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই সোনাকে শুধুমাত্র ‘দাম বাড়বেই’ এমন সম্পদ হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক দ্রুত উত্থানের পরে স্বল্পমেয়াদে সংশোধন বা correction হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। রয়টার্সও উল্লেখ করেছে, গত জুনের ছয় মাসের নিম্নস্তর থেকে সোনা প্রায় ১০ শতাংশ পুনরুদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে বাজারে লাভ তুলে নেওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে আগামী দিনের Gold Price নির্ধারণে নজর থাকবে চারটি বড় বিষয়ে: মার্কিন Federal Reserve-এর সুদের হার, ডলারের গতিপথ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলির সোনা কেনার প্রবণতা। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনা এখনও portfolio diversification-এর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামা এবং ঝুঁকিকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।

