ভারতে ক্যান্সার এখন শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, ধীরে ধীরে তা বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (IARC)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে দেশে নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়া, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত ঝুঁকি—এই সবকিছু মিলিয়েই উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যান্সারের বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য বা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সফলভাবে চিকিৎসা সম্ভব। তাই সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ঝুঁকির কারণ কমিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
কেন বাড়ছে ক্যান্সারের ঝুঁকি?
WHO এবং IARC-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্যান্সারের প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—
তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব
বায়ুদূষণ
অ্যালকোহল সেবন
কিছু ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যেমন HPV ও হেপাটাইটিস বি
ভারতের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ধূমপান, গুটখা, খৈনি এবং অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এখনও অন্যতম বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০৫০ সালে কী হতে পারে?
আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রতি বছর নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর অন্যতম কারণ শুধু রোগের হার বৃদ্ধি নয়; বরং দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়াও এই প্রবণতার বড় কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে হাসপাতাল, চিকিৎসক, ওষুধ এবং ক্যান্সার চিকিৎসার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
ভারতে কোন ধরনের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ভারতে নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্যান্সারের ধরনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়—
মুখগহ্বরের ক্যান্সার
ফুসফুসের ক্যান্সার
খাদ্যনালির ক্যান্সার
মহিলাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়—
স্তন ক্যান্সার
জরায়ুমুখের (সার্ভিক্যাল) ক্যান্সার
ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার
মুখগহ্বরের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে তামাকের ব্যবহার এখনও অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়।
HPV সংক্রমণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মহিলাদের সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ হল Human Papillomavirus (HPV) সংক্রমণ।
WHO বহু বছর ধরেই HPV টিকাকরণকে উৎসাহিত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট বয়সে এই টিকা নেওয়া হলে ভবিষ্যতে সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এর পাশাপাশি নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন লক্ষণগুলোকে অবহেলা করবেন না?
চিকিৎসকদের মতে, অনেক সময় ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ খুব সাধারণ মনে হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যেমন—
শরীরে দীর্ঘদিনের ঘা না শুকানো
অকারণে দ্রুত ওজন কমে যাওয়া
দীর্ঘদিন কাশি বা কণ্ঠস্বর পরিবর্তন
গিলতে অসুবিধা
অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ
শরীরে নতুন গাঁট বা ফোলা
দীর্ঘদিনের ক্লান্তি
এই লক্ষণগুলির সবই যে ক্যান্সারের কারণে হবে, এমন নয়। তবে কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসা পরীক্ষা জরুরি।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়া?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্যান্সার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তাহলে চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।
কিন্তু ভারতে এখনও বহু রোগী দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছান। ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে এবং ব্যয়ও বেড়ে যায়।
এই কারণেই WHO বারবার স্ক্রিনিং, সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার উপর জোর দিচ্ছে।
ক্যান্সার প্রতিরোধে WHO কী পরামর্শ দিচ্ছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সারের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এর জন্য তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা বলছে—
সব ধরনের তামাক সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা
অ্যালকোহল কমানো বা বর্জন করা
প্রতিদিন নিয়মিত শরীরচর্চা
সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা
অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
শিশু ও কিশোরদের HPV এবং Hepatitis-B টিকাকরণ
নির্দিষ্ট বয়সের পরে নিয়মিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং করা
বায়ুদূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমানো
সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
ক্যান্সার শুধু একটি রোগ নয়; এটি একটি পরিবার ও সমাজের উপরও বড় অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে অনেক পরিবার আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়।
তাই চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা?
ভারতে ক্যান্সারের সম্ভাব্য বৃদ্ধি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। তবে এটিকে অনিবার্য ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, তামাক বর্জন, সময়মতো টিকাকরণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের মাধ্যমে বহু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
WHO এবং IARC-ও একই বার্তা দিচ্ছে—ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হল সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং দ্রুত চিকিৎসা। ব্যক্তি, পরিবার ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই আগামী দিনে এই রোগের বাড়তে থাকা বোঝা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

