নতুন নিরাপত্তা বিল আনছে রাজ্য, প্রতিরোধমূলক আটক ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রস্তাব

NEWS INDIA বাংলা
0
West Bengal Public Safety Bill preventive detention law update


পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা আরও কঠোর করার লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপের পথে রাজ্য সরকার। সংগঠিত অপরাধ, দুষ্কৃতীচক্র এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে প্রশাসন। সেই লক্ষ্যেই আনা হচ্ছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাবিত বিলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে এবং আসন্ন বিধানসভা অধিবেশনেই এটি পেশ করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।


এই বিলের পাশাপাশি ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অফ পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট, ১৯৭২’-এর সংশোধনী বিলও আনার প্রস্তুতি চলছে। দুই বিল একসঙ্গে কার্যকর হলে সংগঠিত অপরাধ, সম্পত্তি ধ্বংস, দুষ্কৃতী কার্যকলাপ এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রশাসনের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা চলে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।



জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার


সরকারের দাবি, নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য হল সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধচক্রের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করা।


প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, এমন কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি সংগঠিতভাবে এমন কাজ করে, যা মানুষের জীবন, সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য বা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।


রাজনৈতিক মহলের মতে, উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটে চালু থাকা সংগঠিত অপরাধবিরোধী আইনের ধাঁচেই পশ্চিমবঙ্গেও একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।



এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক



এই বিলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হল প্রিভেনটিভ ডিটেনশন বা প্রতিরোধমূলক আটকের বিধান।


প্রস্তাব অনুযায়ী, যদি প্রশাসনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য থাকে যে কোনও ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে আদালতের নিয়মিত বিচার শুরুর আগেই তাঁকে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটক রাখার সুযোগ থাকবে।


তবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলেও বিলে উল্লেখ রয়েছে।




সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা



শুধু গ্রেফতার নয়, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক উৎস বন্ধ করতেও জোর দেওয়া হয়েছে নতুন প্রস্তাবে।


বিলে বলা হয়েছে, সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ধারা প্রয়োগ করে তাঁর স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।


যদি কোনও অভিযুক্ত তদন্ত চলাকালীন পলাতক হয়ে যান এবং আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে তাঁর সম্পত্তি সংযুক্ত বা বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।




কোন ধরনের কাজকে 'সমাজবিরোধী কার্যকলাপ' ধরা হবে?



প্রস্তাবিত আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞাও বিস্তৃত করা হয়েছে।


এর মধ্যে রয়েছে—


সাধারণ মানুষের জীবন বা সম্পত্তির জন্য বিপজ্জনক কার্যকলাপ।

ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশাগত কাজকর্মে ইচ্ছাকৃত বাধা সৃষ্টি।

প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ ব্যবহার বা খনন।

বনজ সম্পদ লুট বা সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি।

সংঘবদ্ধ অপরাধমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে এলাকায় ভীতি বা অস্থিরতা তৈরি করা।

সরকারের মতে, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই নতুন আইনি কাঠামো প্রয়োজন।




কারা ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন?




বিলে কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিকে এই আইনের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।


এর মধ্যে রয়েছেন—


সংগঠিত অপরাধচক্রের সদস্য বা নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি।

গুরুতর সংঘবদ্ধ অপরাধে চার্জশিটভুক্ত অভিযুক্ত।

অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার বা বিস্ফোরক সংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি।

অপরাধচক্রকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করা ব্যক্তি।

প্রশাসনের মূল্যায়নে সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচিত ব্যক্তি।

তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংজ্ঞাগুলির প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা ভবিষ্যতে আদালতের ব্যাখ্যার উপরও নির্ভর করবে।




আটক প্রক্রিয়ায় কী নিয়ম থাকবে?



বিল অনুযায়ী, পুলিশ সুপার বা তার ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আটকের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।


অন্যদিকে, জরুরি পরিস্থিতিতে পুলিশ কমিশনার বা জেলা শাসকও আটক নির্দেশ দিতে পারবেন। তবে সেই সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে।


এছাড়া অভিযুক্ত ব্যক্তি পলাতক হলে আদালতের মাধ্যমে হাজিরার নির্দেশ জারি করা হবে। নির্দেশ অমান্য করলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পথও খুলে যাবে।


গঠন হবে বিশেষ অ্যাডভাইজরি বোর্ড

আইনের অপব্যবহার রোধে একটি স্বাধীন অ্যাডভাইজরি বোর্ড গঠনেরও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।


এই বোর্ডে একজন বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতি চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন। পাশাপাশি আরও দুই সদস্য থাকবেন, যাঁদের উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।


আটক ব্যক্তি চাইলে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবেন এবং বোর্ড সেই মামলার যৌক্তিকতা বিচার করবে।




অশান্তি রুখতে এলাকা থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতাও



প্রস্তাবিত আইনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও ব্যক্তি কোনও এলাকায় অশান্তি বা অপরাধমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন বলে প্রশাসনের আশঙ্কা থাকলে, তাঁকে ওই এলাকা থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বহিষ্কার বা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যেতে পারে।


আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই ব্যবস্থাকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার।




ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আদায়ে নতুন ব্যবস্থা



সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থাও আনা হচ্ছে সংশোধনী বিলে।


এর জন্য একটি ক্লেমস কমিশন গঠন করা হবে। অতিরিক্ত জেলাশাসক বা তার ঊর্ধ্বতন কোনও আধিকারিক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।


বিক্ষোভ, অবরোধ বা আন্দোলনের সময় যদি সরকারি বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির ক্ষতি হয়, তাহলে তদন্তের ভিত্তিতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকেই সেই অর্থ আদায় করা হতে পারে।



সমর্থন ও সমালোচনা—দুই-ই



সরকারের দাবি, সংগঠিত অপরাধ এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে এই আইন কার্যকর ভূমিকা নেবে। অপরাধচক্রের আর্থিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।


অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠনগুলির একাংশের আশঙ্কা, প্রতিরোধমূলক আটক এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার মতো ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁদের মতে, এই ধরনের আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং বিচারিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


এখন নজর বিধানসভার দিকে। বিলটি পাস হলে পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষকরা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!