পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে রাজ্যের মাটিতে এসে উন্নয়ন, ইতিহাস এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শনিবার তারকেশ্বরে আয়োজিত এক সরকারি অনুষ্ঠানে একাধিক রেল ও কৃষি প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আশাবাদী বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরও কড়া ভাষায় আক্রমণ শানান প্রধানমন্ত্রী।
দু’দিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরের প্রথম দিনে তারকেশ্বরের সভামঞ্চে উপস্থিত হয়ে মোদী বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং বর্তমান পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের প্রসঙ্গ।
বাংলার পরিবর্তনের কথা তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
বক্তৃতার শুরুতেই ‘জয় বাবা তারকনাথ’ এবং ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিয়ে উপস্থিত জনতাকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী। এরপর বাংলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষ এখন পরিবর্তনের সুফল দেখতে শুরু করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়া বাংলা এখন নতুন সম্ভাবনার পথে এগোচ্ছে। মানুষের ভোটের শক্তি যে কত বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের আশাবাদও স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে রাজনৈতিক বার্তা
পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে দেশভাগের ইতিহাস এবং বাংলার রাজনৈতিক অতীতের কথাও স্মরণ করেন মোদী। তিনি ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকার উল্লেখ করে বলেন, বাংলার ইতিহাস শুধু সংগ্রামের নয়, আত্মত্যাগ ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসও।
একইসঙ্গে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ রাজনৈতিক শাসনের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, বছরের পর বছর ভুল নীতির কারণে বাংলার উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ এবং তোষণের রাজনীতি নিয়েও তিনি সরব হন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া অবস্থানের বার্তা
সভা থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অবস্থানও স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষের অর্থ লুট করে যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ফলে সাধারণ মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন।
বাংলায় ‘কাটমানি সংস্কৃতি’ এবং সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি বলেন, উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো সেই পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
কৃষকদের জন্য নতুন উদ্যোগ
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষিক্ষেত্রে একাধিক উদ্যোগের ঘোষণা। প্রধানমন্ত্রী জানান, পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পিএম ফসল বিমা যোজনা। এর ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলের ক্ষতির ঘটনায় কৃষক পরিবারগুলি আর্থিক সুরক্ষা পাবে।
এছাড়াও কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে রাজ্যকে ডিজিটাল এগ্রিকালচার মিশনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং তথ্যভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করবে।
রেল ও অবকাঠামো উন্নয়নে জোর
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলার রেল ও মেট্রো পরিকাঠামো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কলকাতার চিংড়িঘাটা সংলগ্ন মেট্রো প্রকল্পের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই কেন্দ্র কাজ করছে।
পাশাপাশি পানীয় জল সরবরাহ, মহিলাদের কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং যুব সম্প্রদায়ের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একাধিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আগামী দিনে আরও দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক যোগ দিবস নিয়েও বিশেষ বার্তা
আগামী ২১ জুন আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। তারকেশ্বরের সভা থেকেই তিনি রাজ্যবাসীকে যোগ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
বক্তৃতার শেষ মুহূর্তে তিনি বলেন, বাংলা সম্ভাবনায় ভরপুর একটি রাজ্য। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামোগত অগ্রগতির মাধ্যমে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। তাঁর কথায়, “বাংলা এবার আর থামবে না, ইতিহাস গড়বে।”
রাজনৈতিক বার্তা, উন্নয়নমূলক ঘোষণা এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা—সব মিলিয়ে তারকেশ্বরের সভা থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার বার্তাই তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী।

