ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগোল। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে ভারতকে প্রায় ৪,৫৬৬ কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিকীকরণ আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
মার্কিন প্রশাসনের অনুমোদিত এই প্যাকেজের আওতায় রয়েছে অ্যাপাচে যুদ্ধ হেলিকপ্টারের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, এম-৭৭৭ আল্ট্রালাইট হাউইৎজার কামানের বিভিন্ন উপাদান, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিষেবা।
কৌশলগত অংশীদারিত্বে নতুন বার্তা
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত-আমেরিকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং আধুনিক সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক বছরে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক অনুমোদনকে সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত সংস্থার তরফে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তিতে শুধু অস্ত্র বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ নয়, বরং সামগ্রিক অপারেশনাল সাপোর্টও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অ্যাপাচে হেলিকপ্টারকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ
ভারতীয় বায়ুসেনা ও সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণাত্মক প্ল্যাটফর্ম হল অ্যাপাচে এএইচ-৬৪ই যুদ্ধ হেলিকপ্টার। আধুনিক সেন্সর, উন্নত টার্গেটিং সিস্টেম এবং শক্তিশালী অস্ত্র বহনের ক্ষমতার কারণে এই হেলিকপ্টারকে বিশ্বের অন্যতম কার্যকর যুদ্ধ হেলিকপ্টার হিসেবে গণ্য করা হয়।
অ্যাপাচে একাধিক লক্ষ্যবস্তু একসঙ্গে শনাক্ত করতে পারে এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এতে ব্যবহৃত উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট সিস্টেম এবং অটোমেটিক কামান যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ দেয়।
নতুন প্যাকেজের ফলে ভারতের হাতে থাকা অ্যাপাচে বহরের কার্যক্ষমতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতে আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা সহজ হবে।
সীমান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এম-৭৭৭ কামানের
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল এম-৭৭৭ আল্ট্রালাইট হাউইৎজার কামানের জন্য সহায়তা। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এই কামানকে বিশেষভাবে কার্যকর বলে মনে করা হয়, কারণ এর ওজন তুলনামূলকভাবে কম হলেও গোলাবর্ষণের ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী।
টাইটেনিয়াম নির্মিত হওয়ায় এই কামানকে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায়। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকাতেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ফলে লাদাখ, অরুণাচল প্রদেশ কিংবা অন্যান্য উচ্চ পার্বত্য সীমান্ত অঞ্চলে এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ভারী ফায়ারপাওয়ার হিসেবে এম-৭৭৭ ইতিমধ্যেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে।
শুধু অস্ত্র নয়, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও
এই সামরিক সহায়তা প্যাকেজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। অস্ত্র ব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং মেরামতির সুবিধাও দেওয়া হবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে শুধুমাত্র উন্নত অস্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়। সেই অস্ত্রের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দক্ষ জনবলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন শক্তি
ভারত বর্তমানে প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। একদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে, অন্যদিকে কৌশলগত অংশীদার দেশগুলির সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও জোরদার করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক অনুমোদন সেই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং আধুনিক যুদ্ধ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

