দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেল। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পুনরায় পর্যটন ভিসা (Tourist Visa) চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। এই ঘোষণার ফলে শুধু দুই দেশের মানুষের যাতায়াতই সহজ হবে না, বরং সাম্প্রতিক সময়ের কূটনৈতিক দূরত্বও অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলির মধ্যে একটি হিসেবে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, আগামী ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশে আবার পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের কাছে এই খবর নিঃসন্দেহে স্বস্তির।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। দেশজুড়ে অস্থিরতা, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদলের পর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল।
তবে চিকিৎসা, শিক্ষা বা বিশেষ জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত কিছু ভিসা পরিষেবা চালু থাকলেও সাধারণ পর্যটকদের জন্য ভারতের দরজা কার্যত বন্ধই ছিল। ফলে বহু পরিবার, পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষ সমস্যার মুখে পড়েছিলেন।
ভারতীয় হাইকমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি নির্দিষ্ট ভিসা আবেদন কেন্দ্রে পর্যটন ভিসার আবেদন জমা নেওয়া হবে। আবেদনকারীরা আগের নিয়মেই অনলাইনে নিবন্ধন করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে পারবেন।
এই সিদ্ধান্তের ফলে চিকিৎসার বাইরে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, ধর্মীয় পর্যটন এবং অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্যে ভারত সফরের পথ আবার খুলে যাচ্ছে।
অনেক বাংলাদেশি নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা, দিল্লি, আগ্রা, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি কিংবা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। নতুন সিদ্ধান্ত তাঁদের সেই সুযোগ ফিরিয়ে দেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু কূটনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুই দেশের পর্যটন শিল্প, হোটেল ব্যবসা, পরিবহণ পরিষেবা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক চিকিৎসা, কেনাকাটা এবং পর্যটনের জন্য ভারতে আসেন। বিশেষ করে কলকাতা, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই ও দিল্লির মতো শহরগুলিতে বাংলাদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
ভিসা পরিষেবা স্বাভাবিক হওয়ায় সেই অর্থনৈতিক কার্যকলাপ আবারও গতি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে একাধিকবার ভারতকে ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ভিসা প্রদান স্বাভাবিক করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষকরা।
অনেকের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত ও বাংলাদেশের সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই পদক্ষেপ শুধু ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর কূটনৈতিক বার্তাও বহন করছে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করার বার্তা দিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
তিনি জানিয়েছেন, পারস্পরিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং দুই দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের ভিত্তিতেই আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন হাইকমিশনারের এই বার্তা এবং ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত একসঙ্গে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করছে।
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নথির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ব্যবসা এবং কোটি কোটি মানুষের আবেগ।
দীর্ঘ দুই বছরের বিরতির পর আবার যখন ভ্রমণের পথ খুলছে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ইতিমধ্যেই নতুন করে ভারত সফরের পরিকল্পনা শুরু করেছেন।
সব মিলিয়ে, পর্যটন ভিসা পুনরায় চালুর এই সিদ্ধান্তকে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। আগামী দিনে এই ইতিবাচক ধারা আরও জোরদার হবে কি না, এখন সেদিকেই নজর থাকবে দুই দেশের মানুষের।

