রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিভিক ভলান্টিয়াররা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি কাজে পুলিশ প্রশাসনের সহায়ক শক্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাঁরা। তবে এবার তাঁদের নিয়োগ ও কর্মপদ্ধতি নিয়ে বড়সড় পর্যালোচনার পথে হাঁটল রাজ্য সরকার। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের নতুন নির্দেশিকাকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে যেমন তৎপরতা বেড়েছে, তেমনই উদ্বেগ ছড়িয়েছে বহু সিভিক ভলান্টিয়ারের মধ্যেও।
সোমবার রাজ্য বাজেট পেশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে সিভিক ভলান্টিয়ার ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা নানা অসঙ্গতি খতিয়ে দেখা হবে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ব্যবস্থার মধ্যে অনেক অস্বচ্ছতা রয়েছে এবং সেই কারণেই প্রয়োজন একটি বিস্তৃত যাচাই প্রক্রিয়ার। সেই ঘোষণার পরই স্বরাষ্ট্র দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নির্দেশিকা জারি করে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে রাজ্যজুড়ে কর্মরত সিভিক ভলান্টিয়ারদের নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত নথি পুনরায় খতিয়ে দেখা হবে। নিয়োগের সময় নির্ধারিত নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করার পাশাপাশি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও প্রকার রাজনৈতিক সুপারিশ বা প্রভাব কাজ করেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসবে।
শুধু নিয়োগ নয়, সিভিক ভলান্টিয়ারদের দৈনন্দিন কাজের রেকর্ডও এবার প্রশাসনের নজরে। গত দুই বছরের উপস্থিতি, দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা, কর্মদক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতার মতো বিষয়গুলিও মূল্যায়ন করা হবে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ কেবলমাত্র নিয়োগপত্র দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, একজন কর্মী বাস্তবে কতটা দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেছেন, সেটাও বিবেচনায় আসবে।
প্রশাসনের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল যে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ পদ্ধতির পরিবর্তে প্রভাব খাটিয়ে সিভিক ভলান্টিয়ার নিয়োগ করা হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে এমনও অভিযোগ ওঠে যে কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন বা রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সবকটির প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি, তবুও সরকার এবার সেই প্রশ্নগুলির নিরপেক্ষ উত্তর খুঁজতে চাইছে।
এই প্রসঙ্গে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও কড়া অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে সমস্ত অভিযোগ জমা হয়েছে, সেগুলির সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের লক্ষ্য।
মন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে এমন কর্মী রয়েছেন যাঁরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না। উপস্থিতির খাতায় স্বাক্ষর থাকলেও বাস্তবে তাঁদের কর্মস্থলে দেখা যায় না বলেও দাবি করেন তিনি। সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই ধরনের অভিযোগের তদন্ত জরুরি বলেই মনে করছে প্রশাসন।
তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অনিয়ম দূর করতে এবং প্রকৃত কর্মীদের মর্যাদা দিতে এই যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। অন্যদিকে অনেক সিভিক ভলান্টিয়ার মনে করছেন, যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন তাঁদের যেন অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যাচাই অভিযান কেবল নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়ানোর জন্য নয়, ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। কারণ সিভিক ভলান্টিয়াররা সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করেন এবং তাঁদের কার্যক্ষমতা প্রশাসনের সামগ্রিক পরিষেবার উপরও প্রভাব ফেলে।
এখন নজর আগামী তিন মাসের দিকে। কারণ এই সময়সীমার মধ্যেই রাজ্যজুড়ে হাজার হাজার সিভিক ভলান্টিয়ারের নথি ও কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার কথা। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতে কারা দায়িত্বে বহাল থাকবেন, কারা নতুন করে যাচাইয়ের মুখে পড়বেন এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা স্পষ্ট হবে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই পদক্ষেপ তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজ্যের সিভিক ভলান্টিয়ার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

