চাপড়ায় মহুয়া মৈত্রকে ঘিরে বিক্ষোভ, হাইকোর্টের নিরাপত্তা নির্দেশে বাড়ল রাজনৈতিক চাপ
বিক্ষোভের পর মহুয়া মৈত্রের নিরাপত্তায় হাইকোর্টের নির্দেশ, কৃষ্ণনগর ঘিরে নজর রাজনৈতিক মহলে
মহুয়া মৈত্রকে ঘিরে নদিয়ায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র। একদিকে কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ, কালো পতাকা প্রদর্শন এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগানের অভিযোগ, অন্যদিকে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ—পরপর দুই ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় নদিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি। নির্বাচনী এলাকায় জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, নদিয়ার চাপড়ায়। তৃণমূলের কর্মী সম্মেলনে যোগ দিতে সেখানে গিয়েছিলেন মহুয়া মৈত্র। কর্মসূচি শেষে বেরোনোর সময় তাঁর গাড়িকে ঘিরে একদল বিক্ষোভকারী কালো পতাকা দেখান এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেন বলে অভিযোগ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একাংশ গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি গাড়ির বোনেটে চাপড় মারার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তৃণমূল এবং বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয় বলে জানা যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে। মহুয়া মৈত্র এই বিক্ষোভকে বিজেপির পরিকল্পিত কর্মসূচি বলে অভিযোগ করেন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে বিক্ষোভের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনার মধ্যেই মহুয়া মৈত্রের নিরাপত্তার বিষয়টি পৌঁছয় কলকাতা হাইকোর্টে। আদালতে তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, নিজের লোকসভা কেন্দ্রে গেলে সাংসদকে লক্ষ্য করে ডিম, আলু, পাথর এবং টমেটো ছোড়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এর ফলে নির্বাচনী এলাকায় স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি সমস্যার মুখে পড়ছেন বলে দাবি করা হয়।
বিষয়টি বিবেচনা করে হাইকোর্ট কৃষ্ণনগর পুলিশকে মহুয়া মৈত্রের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তিনি যখন নিজের লোকসভা কেন্দ্রে প্রবেশ করবেন, তখন তাঁর সঙ্গে দু’জন পুলিশকর্মী মোতায়েন রাখতে বলা হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আপাতত ৩০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। আদালতের পরবর্তী শুনানি ১ অক্টোবর নির্ধারিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহুয়া মৈত্রের কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রে যাওয়ার তারিখগুলি আগে থেকে পুলিশকে জানাতে হবে। সেই অনুযায়ী নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে পুলিশ। আদালতের এই নির্দেশ রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণও এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ। আদালত জানিয়েছে, কোনও সাংসদের উপর এ ধরনের আক্রমণ বা হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজ্য প্রশাসনকে বিষয়টি কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে হবে। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু একজন সাংসদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে নয়, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নিজের এলাকায় গিয়ে রাজনৈতিক ও সাংসদীয় কাজ করার অধিকার এবং সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নদিয়ায় তৃণমূল ও বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এবং তার পর আদালতের নিরাপত্তা নির্দেশ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভে কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, সেখানে আইনভঙ্গের ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং ঘটলে তার দায় কার—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনিক ও পুলিশি তদন্তের উপরই নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, মহুয়া মৈত্রকে ঘিরে চাপড়ার বিক্ষোভ এখন আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা থাকছে না। আদালতের নিরাপত্তা নির্দেশের পর কৃষ্ণনগর লোকসভা এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচি, জনপ্রতিনিধির নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর নজর আরও বাড়ল।


