বারাসতে প্রথম ডার্বি, শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি তুঙ্গে! টিকিটের হাহাকার থেকে নিরাপত্তা—কী ব্যবস্থা নিল IFA
আর মাত্র দু’দিন, বারাসতে প্রথম ইস্ট-মোহন ডার্বি ঘিরে কেন এত উত্তেজনা?
আগামী সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, বারাসতের বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হতে চলেছে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান। কলকাতা ফুটবল লিগের (CFL) এই ডার্বি শুরু হবে বিকেল ৫টায়। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের বাইরে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর এমন মহারণ নতুন নয়, কিন্তু বারাসতের এই মাঠে ইস্ট-মোহন ডার্বি এই প্রথম। ফলে ম্যাচ ঘিরে উত্তর ২৪ পরগনার ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনা ইতিমধ্যেই তুঙ্গে।
ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে টিকিট। শুক্রবার অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর প্রবল চাহিদা তৈরি হয়। ‘ডিস্ট্রিক্ট বাই জোম্যাটো’ অ্যাপের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করা হলেও শুরুতেই অনেক সমর্থক টিকিট না পাওয়ার অভিযোগ করেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় গ্যালারি নিয়েও বিভ্রান্তি। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্য নির্দিষ্ট অংশের টিকিট কাটতে গিয়ে মোহনবাগান সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ গ্যালারির টিকিট পাওয়া যাচ্ছে—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি পরিষ্কার করতে মুখ খোলেন ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (IFA)-এর সচিব অনির্বাণ দত্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বারাসত স্টেডিয়ামে প্রায় ১০ হাজার দর্শকের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। কোন দলের সমর্থক কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করবেন এবং কোন অংশে বসবেন, সেই হিসাব করেই জায়গা ভাগ করা হয়েছে। প্রথম দিন পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টিকিট ছাড়া হয়েছিল। ভুলত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের পর আরও টিকিট ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দর্শকদের সুবিধার জন্য এবার পেপারলেস ডিজিটাল টিকিটের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রিন্ট করা টিকিট সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই; মোবাইলে টিকিট দেখিয়েই প্রবেশ করা যাবে। টিকিটের ন্যূনতম দাম ১৫০ টাকা রাখা হয়েছে। ক্লকরুম, পানীয় জল এবং খাবারের মতো প্রয়োজনীয় পরিষেবার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে IFA।
ডার্বিকে সামনে রেখে বারাসত স্টেডিয়ামের পরিকাঠামোতেও বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন কার্যত বেহাল অবস্থায় পড়ে থাকা এই মাঠে চলতি বছরের আগস্টে কলকাতা লিগের ম্যাচ আয়োজন করা হয়। এরপর ডার্বির মতো বড় ম্যাচের জন্য মাঠ, ফ্লাডলাইট, প্রেস বক্স, ভিআইপি রুম ও গ্যালারির একাধিক অংশে সংস্কারের কাজ করা হয়েছে।
স্টেডিয়ামের প্রস্তুতিতে বারাসতের বিধায়ক শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের উদ্যোগও সামনে এসেছে। তাঁর উপস্থিতিতে IFA সচিব অনির্বাণ দত্ত, পুলিশ ও প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। এরপর ফ্লাডলাইট পরীক্ষা করা হয় এবং ম্যাচ আয়োজনের জন্য আলোকে উপযুক্ত বলে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। দর্শকের চাপ সামলাতে পুরনো তিনটি গেটের পাশাপাশি চতুর্থ গেট তৈরির কাজও করা হয়েছে। দুই দলের সমর্থকদের জন্য পৃথক ব্লকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিয়েও থাকছে বিশেষ নজর। দুই দলের সমর্থকদের পৃথক পথে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করানো, খেলোয়াড় ও টিম বাসের নিরাপত্তা এবং ম্যাচ শেষে দর্শকদের সুষ্ঠুভাবে বের করে দেওয়া—সবদিক বিবেচনা করছে পুলিশ। পাশাপাশি ম্যাচের সময় বারাসত শহরের যান চলাচল যাতে বড়সড় সমস্যার মুখে না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
মাঠের লড়াইয়ের দিক থেকেও ডার্বির গুরুত্ব কম নয়। বর্তমানে কলকাতা লিগের গ্রুপ ‘এ’-তে ইস্টবেঙ্গল ১০ ম্যাচে ২৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দলটি এখনও অপরাজিত। মোহনবাগানের সংগ্রহ ১০ ম্যাচে ২২ পয়েন্ট। দুই দলই সুপার সিক্সে জায়গা নিশ্চিত করেছে। ফলে সোমবারের ম্যাচটি শুধু মর্যাদার লড়াই নয়, লিগের পয়েন্টের হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
এর উপর রয়েছে ডুরান্ড কাপের সাম্প্রতিক স্মৃতি। ২৩ আগস্ট ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে মোহনবাগানকে হারিয়ে ২২ বছর পর ডুরান্ড কাপ জেতে। এডমন্ড লালরিন্দিকার হ্যাটট্রিক-সহ সেই জয়ের পর ফের দুই দল মুখোমুখি। তাই মোহনবাগানের কাছে এটি ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ, আর ইস্টবেঙ্গলের সামনে সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে ৭ সেপ্টেম্বরের ডার্বিকে ঘিরে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। টিকিট নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি সামলানোর পাশাপাশি মাঠ, ফ্লাডলাইট, গেট, দর্শক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রস্তুতি চলছে। প্রথমবার বারাসতের মাটিতে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান দ্বৈরথ কতটা দর্শক টানতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সোমবার বিকেল ৫টায় সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গনেই।



