কৃষ্ণসাগরে রুশ অবরোধে ইউক্রেনের ফসল বন্দরে আটকে, বাড়ছে বিশ্ব খাদ্য সংকটের আশঙ্কা
মাঠে ফলন ভালো, কিন্তু বিক্রির পথ বন্ধ! কৃষ্ণসাগর ঘিরে নতুন বিপাকে ইউক্রেনের কৃষকরা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবার আরও গভীরভাবে পড়ছে ইউক্রেনের কৃষি অর্থনীতিতে। কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলিতে হামলা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধার জেরে দেশের শস্য রপ্তানি কার্যত ধাক্কা খেয়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টের শুরুতে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ থেকে ৭৬ শতাংশ কমেছে। ফলে ভালো ফলন হলেও কৃষকদের সামনে ফসল বিক্রি করে নগদ অর্থ পাওয়ার পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখীজাত পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। দেশের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয় কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর দিয়ে। কিন্তু ওডেসা-সহ দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরগুলিতে হামলা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় সমুদ্রপথে রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিকল্প হিসেবে রেল, সড়ক এবং দানিয়ুব নদীপথ ব্যবহার করা হলেও সেগুলির ক্ষমতা সমুদ্রবন্দরের তুলনায় অনেক কম। ইউক্রেনের কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিকল্প রুটগুলি আগের সমুদ্রপথের মাত্র প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ পণ্য বহন করতে পারবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের উপর। ফসল গুদামে জমে থাকলে নতুন ফসল সংরক্ষণের জায়গা কমে যায়। পাশাপাশি শস্যের দাম পড়ে গেলে কৃষকরা বীজ, সার, জ্বালানি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কেনার অর্থ জোগাড় করতে সমস্যায় পড়তে পারেন। ইতিমধ্যেই রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ইউক্রেনের কৃষি খাতে বড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও কৃষকদের অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বিভিন্ন সহায়তা ও অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সমস্যা আরও জটিল হয়েছে দানিয়ুব নদীপথের ওপর বাড়তি নির্ভরতার কারণে। বিকল্প রুট হিসেবে এই পথটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও নদীতে জলস্তর কমে যাওয়ায় পরিবহণ ক্ষমতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। তার উপর ১৩ আগস্ট রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ দানিয়ুব বন্দর ইজমাইলের পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সমুদ্রপথের বিকল্প তৈরি করার চেষ্টাও নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক প্রভাব নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বহু দেশ ইউক্রেনীয় কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইউক্রেনের রপ্তানি দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে শস্যের সরবরাহ কমতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের কারণে শুধু ইউক্রেন নয়, রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ও শস্য পরিকাঠামোও হামলার মুখে পড়ছে। ১২ আগস্ট ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার নোভোরোসিস্ক বন্দরের দুটি বড় শস্য টার্মিনাল সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করেছিল বলে Reuters জানিয়েছে।
সংকট কমাতে ইউক্রেন কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজ ও বাণিজ্যিক পরিকাঠামোর ওপর হামলা বন্ধের প্রস্তাব দিয়েছে বলে Reuters জানিয়েছে। তুরস্কও এই অঞ্চলে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পক্ষে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ১৪ আগস্ট রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে যুদ্ধবিরতির ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে দ্রুত বাণিজ্যিক নৌপথ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে, কৃষ্ণসাগরের এই অস্থিরতা ইউক্রেনের কৃষকদের আয়, দেশের রপ্তানি অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য সরবরাহ, তিন ক্ষেত্রেই চাপ বাড়াচ্ছে। আগামী সপ্তাহগুলিতে বন্দরগুলির পরিস্থিতি এবং নিরাপদ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কতটা ফিরছে, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে ইউক্রেনের নতুন ফসল বিশ্ববাজারে পৌঁছতে পারবে কি না।

