SIR-এ বাদ ভোটারদের আপিলের কী অবস্থা? নির্বাচন কমিশনের কাছে হিসাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট

NEWS INDIA বাংলা
0

 

SIR-এ ভোটার তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন

কত আবেদন নিষ্পত্তি, কত এখনও বাকি? নির্বাচন কমিশনের কাছে হিসাব চাইল শীর্ষ আদালত

West Bengal SIR voter list Supreme Court hearing Election Commission


সম্পাদকীয় : পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার Special Intensive Revision বা SIR নিয়ে বিতর্ক এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ আইনি পর্যায়ে পৌঁছল। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের বিরুদ্ধে আপিলের কতগুলি এখনও বিচারাধীন, কতগুলি ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং সেই নিষ্পত্তির প্রকৃত অগ্রগতি কতটা, এবার সেই হিসাবই নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চাইল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে এদিন এই বিষয়টি উঠে আসে। কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি হয়।

এই নির্দেশের গুরুত্ব শুধু প্রশাসনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকা একটি নির্বাচনের মূল ভিত্তি। কোনও নাগরিকের নাম তালিকায় না থাকলে তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। তাই SIR-এর মতো বৃহৎ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়ার পরে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টের এদিনের পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, শুধু আপিল করার সুযোগ থাকলেই যে সমস্যার সমাধান হয় না, আদালত সেটি স্পষ্ট করেছে। শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানতে চান, কতগুলি আবেদন বা আপিল বাস্তবে নিষ্পত্তি হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ভোটার আপিল করেছেন কি না, তার পাশাপাশি সেই আপিলের পরিণতি কী হয়েছে, সেটিও বিচারব্যবস্থার নজরে গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই উঠে আসে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভোটারদেরও নিজেদের নাম তালিকায় আছে কি না, বাদ গেলে কেন বাদ গেছে এবং সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কীভাবে আপিল করা যাবে, তা জানার অধিকার রয়েছে। ফলে আপিলের সংখ্যা, নিষ্পত্তির সংখ্যা এবং কতগুলি মামলা এখনও অপেক্ষমাণ, এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে এলে গোটা প্রক্রিয়ার বাস্তব চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সুপ্রিম কোর্ট এদিন আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। আদালত জানিয়েছে, অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালগুলির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ট্রাইব্যুনালগুলির কাজকর্মের উপর নজরদারি এবং তাদের নিষ্পত্তির পরিমাণ সম্পর্কে তথ্য চাওয়ার বিষয়টি আদালতের সক্রিয় পর্যবেক্ষণের ইঙ্গিত বহন করে।

এখানে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। SIR-এর উদ্দেশ্য যদি হয় ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল করা, তা হলে সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারের নাম যেন ভুলভাবে বাদ না যায়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মৃত ভোটার, স্থানান্তরিত ভোটার, একই ব্যক্তির একাধিক নাম বা অন্য কোনও কারণে অযোগ্য নাম বাদ দেওয়ার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু কোনও প্রকৃত ভোটারের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে দ্রুত সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

অন্যদিকে, SIR নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থানও সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, প্রকৃত ভোটারদের একটি অংশ তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শাসক ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে অযোগ্য বা অনুপযুক্ত নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজনীয়। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সত্য কোথায়, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করবে যাচাইযোগ্য তথ্য ও আপিলের ফলাফলের উপর।

এখানে নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল তথ্য দিয়ে আস্থা তৈরি করা। কত নাম বাদ পড়েছে, কী কারণে বাদ পড়েছে, কতজন আপিল করেছেন, কতটি আপিল মঞ্জুর হয়েছে, কতটি খারিজ হয়েছে এবং কতগুলি এখনও বিচারাধীন, এই তথ্য যত স্পষ্টভাবে সামনে আসবে, ততই রাজনৈতিক বিতর্কের বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনা সম্ভব হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভোটার তালিকা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক নথি নয়। এটি নাগরিকের নির্বাচনী অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই কোনও নাম বাদ পড়ার ঘটনা একজন নাগরিকের কাছে নিছক কাগজপত্রের সমস্যা নয়, বরং তাঁর গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন।

সুপ্রিম কোর্টের এদিনের নির্দেশ তাই কোনও পক্ষের রাজনৈতিক জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখলে বিষয়টির গুরুত্ব কমে যাবে। বরং আদালতের প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দু হল, আপিলের ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কাজ করছে। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, SIR নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং স্বচ্ছ তথ্য, নিরপেক্ষ যাচাই এবং কার্যকর আপিল ব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব। প্রকৃত ভোটারের নাম সুরক্ষিত রাখা যেমন জরুরি, তেমনই ভোটার তালিকাকে নির্ভুল রাখাও প্রয়োজন। এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে নিশ্চিত করাই হবে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ভোটার তালিকা সংশোধন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু সেই সংশোধন প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছতা ও দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত না করে, তবে প্রশ্ন উঠবেই। তাই নির্বাচন কমিশনের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল আদালতের চাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এবং প্রতিটি বৈধ আপিলের দ্রুত, ন্যায়সঙ্গত ও যাচাইযোগ্য নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!