অধিকারের জয়: বকেয়া ডিএ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সময়সীমা, বড় জয় রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের
নিজস্ব পেট, নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। দীর্ঘ ১০ বছরের ক্লান্তিকর আইনি যুদ্ধ, ১১০৬ দিনের রাজপথের লড়াই এবং প্রশাসনের হাজারো রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অবশেষে জয়ী হলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আজ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ (DA) কোনো দয়া নয়, এটি কর্মচারীদের আইনগত ও সংবিধিবদ্ধ অধিকার। বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের ডিভিশন বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে— আগামী ৩১শে মার্চের মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ কর্মচারীদের মিটিয়ে দিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের গুরুত্ব স্পষ্ট হয় কেন্দ্র ও রাজ্যের ডিএ-র বর্তমান হারের ব্যবধান দেখলেই। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ৫৮% থেকে ৬০% হারে ডিএ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা পাচ্ছেন মাত্র ১৮% থেকে ২২%। অর্থাৎ, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে এই পার্থক্যের হার প্রায় ৩৮% থেকে ৪০%। যেখানে কেন্দ্র প্রতি ৬ মাস অন্তর নিয়মিত ডিএ সংশোধন করে, সেখানে রাজ্যে তা ছিল অনিয়মিত এবং নামমাত্র। আজকের রায়ের পর এই বিশাল ফারাক মেটানোই এখন নবান্নের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
আজকের শুনানিতে রাজ্য সরকারের আইনজীবীরা 'কেন্দ্রীয় বঞ্চনা' এবং ১০০ দিনের কাজের টাকা না পাওয়ার দোহাই দিয়ে পুনরায় সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু আদালত সেই যুক্তি সরাসরি খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ হলো— রাজ্যের প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা আর কর্মচারীদের অন্ন-বস্ত্রের অধিকার দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ডিএ না দেওয়া মানে পরোক্ষভাবে কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া। আদালতের নির্দেশের মূল তিনটি দিক হলো: ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মেটানো, বাকি বকেয়ার জন্য ৪ সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং ডিএ-কে 'সংবিধিবদ্ধ অধিকার' হিসেবে পুনরায় স্বীকৃতি প্রদান।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের খবর শহীদ মিনারের আন্দোলন মঞ্চে পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক কর্মচারী। একে অপরকে আবির মাখিয়ে ও মিষ্টি মুখ করিয়ে জয়োল্লাস শুরু করেন তাঁরা। সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, "আমরা দয়া চাইনি, আমাদের ন্যায্য অধিকার চেয়েছিলাম। দীর্ঘ ১১০৬ দিনের লড়াই আজ সার্থক হলো। এই জয় সেইসব সতীর্থদের উৎসর্গ করছি যাঁরা এই লড়াইয়ের পথে আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সরকার চাইলেই ডিএ আটকে রাখতে পারে না। ৩১শে মার্চের মধ্যে টাকা না পেলে আমরা পরবর্তী বৃহত্তর আন্দোলনে নামব।"
রায়ের পরেই সরব হয়েছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মেধাবী কর্মচারীদের 'ভিখারি' বলে অপমান করেছিলেন। আদালত আজ তাঁর দর্পচূর্ণ করল। মেলা, খেলা আর ক্লাবে দান করার সময় কোষাগার উপচে পড়ে, আর কর্মচারীদের বেলায় ভাণ্ডার শূন্য? এই দ্বিচারিতা আর চলবে না।" তিনি আরও দাবি করেন, রাজ্য সরকারের ভুল নীতির কারণে আজ সুদের বোঝা সমেত বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদার। তাঁর মতে, এই রায় প্রমাণ করে দিয়েছে যে রাজ্য সরকার এতদিন “তহবিল নেই” বলে যে দাবি করে আসছিল, তা আসলে কর্মচারীদের বঞ্চিত করার একটি অজুহাত ছিল। তিনি আরো বলেন এই রায় আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘ ১১০৬ দিনের লড়াইয়ের নৈতিক জয় বলে উল্লেখ করেছেন।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। আজ বিধানসভায় অন্তর্বর্তী বাজেট বা 'ভোট অন অ্যাকাউন্ট' পেশ হওয়ার দিনে এই রায় কার্যত সরকারের হাত-পা বেঁধে দিল। এখন দেখার, রাজ্য সরকার আদালতের দেওয়া এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মর্যাদা রক্ষা করে কি না, না কি পুনরায় কোনো আইনি দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নেয়।

