ভ্যালেন্টাইন ডে: ইতিহাস, বিতর্ক না কি বাজারের উৎসব? ভালোবাসার দিনের অন্তরালের গল্প
নিজস্বপ্রতিবেদন ,নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: ১৪ ফেব্রুয়ারি—ক্যালেন্ডারের একটি দিন, কিন্তু আবেগের অভিধানে তার আলাদা গুরুত্ব। ভালোবাসা দিবস, যাকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে নামেও চিনি, আজ বিশ্বজুড়ে প্রেম, অনুরাগ ও সম্পর্কের প্রকাশের দিন হিসেবে পরিচিত। তবে এই দিনের পথচলা একরৈখিক নয়; ধর্মীয় স্মরণ থেকে শুরু করে লোকঐতিহ্য, সেখান থেকে বিশ্বায়নের বাজারে প্রবল বাণিজ্যিক উৎসবে রূপান্তর—ভ্যালেন্টাইনের ইতিহাসে রয়েছে নানা স্তর, বিতর্ক ও পুনর্ব্যাখ্যা।
ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, তৃতীয় শতকে রোম সাম্রাজ্যের সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজক শহিদ হন। ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ জেলাসিয়াস প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারিকে তাঁর স্মরণে বিশেষ দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তবে এই ঐতিহাসিক চরিত্রকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি ও বিতর্কও রয়েছে—যার অনেকটাই নির্ভর করে লোককথা ও পরবর্তী কালের ব্যাখ্যার ওপর। ইতিহাসের সঙ্গে মিথের এই মিশ্রণই ভ্যালেন্টাইন দিবসকে একদিকে রহস্যময়, অন্যদিকে বিতর্কিত করে তুলেছে।
সময়ের স্রোতে ধর্মীয় আচার থেকে বেরিয়ে এসে দিনটি ক্রমে রোমান্টিক ভালোবাসার প্রতীকে পরিণত হয়। মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রেমপত্র বিনিময়ের রীতি জনপ্রিয়তা পায়, যা আধুনিক যুগে এসে কার্ড, ফুল, চকোলেট ও নানা উপহারের বিপুল বাজার তৈরি করেছে। আজ যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে কোটি কোটি শুভেচ্ছা কার্ড আদান-প্রদান হয়, বিপুল অর্থ ব্যয় হয় এই এক দিনের উদ্যাপনে। ভালোবাসা যেন এক অর্থনৈতিক শক্তিতেও রূপ নিয়েছে।
তবে ভ্যালেন্টাইন দিবস নিয়ে আপত্তিও কম নয়। বিভিন্ন সময়ে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশে এই উৎসবকে ‘অনৈতিক’ বা ‘ধর্মবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য—ভালোবাসার আড়ালে ভোগবাদ ও সাংস্কৃতিক অনুকরণই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি—ভালোবাসা প্রকাশের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন মানুষের আবেগকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়, সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
ডিজিটাল যুগে এই উৎসবের রূপ আরও বদলেছে। সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা বার্তা, কাস্টমাইজড ক্যাপশন, অনলাইন উপহার—সব মিলিয়ে ভালোবাসার প্রকাশ এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক। টেলিভিশন ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিশেষ অনুষ্ঠান, নাটক ও সংগীতও এই দিনের আবহ তৈরি করে। ব্র্যান্ড ও কর্পোরেট সংস্থাগুলিও এই আবেগঘন মুহূর্তকে বিপণনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ভালোবাসা কি এক দিনের উৎসবে সীমাবদ্ধ? নাকি এটি প্রতিদিনের আচরণ, দায়বদ্ধতা ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়? বাস্তবতা হলো, ভ্যালেন্টাইন দিবস হয়তো একটি প্রতীকী দিন—কিন্তু তার অন্তর্নিহিত বার্তা সম্পর্কের গভীরতা ও মানবিকতার চর্চা।
অতএব, ভালোবাসা দিবসকে কেবল বাজারের উৎসব কিংবা সাংস্কৃতিক অনুকরণ বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন একপাক্ষিক, তেমনি একে অন্ধ উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে দেওয়াও প্রয়োজনীয় নয়। বরং প্রয়োজন সংযম, সচেতনতা ও মূল্যবোধের আলোকে উদ্যাপন। কারণ শেষ পর্যন্ত, ভালোবাসা কোনও নির্দিষ্ট তারিখের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়—তা মানুষের সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই বেঁচে থাকে।

