২০১৬ থেকে ২০২৬: কীভাবে ইউপিআই বদলে দিল ভারতের অর্থনীতির চেহারা
নিজস্ব প্রতিবেদন, নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: সময়টা ২০১৬ সালের শেষ ভাগ। ৮ নভেম্বরের সেই ঐতিহাসিক রাত ভারতের অর্থনৈতিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। বিমুদ্রাকরণ বা নোটবন্দির সেই ঝোড়ো হাওয়ায় যখন গোটা দেশ এটিএম-এর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে জন্ম নিচ্ছিল এক ডিজিটাল মহীরুহ। নাম তার 'ইউনিফাইড পেমেন্ট ইন্টারফেস' বা ইউপিআই (UPI)। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন দেখা যায় গত এক দশকে ভারত কেবল কাগজের নোট ত্যাগ করেনি, বরং গ্রহণ করেছে এক নতুন জীবনদর্শন।
২০১৬ সালে ন্যাশনাল পেমেন্ট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (NPCI) যখন প্রথম ইউপিআই-এর ধারণা সামনে আনে, তখন অর্থনীতিবিদদের একাংশ ভ্রু কুঁচকেছিলেন। ইন্টারনেটের ধীরগতি আর স্মার্টফোনের উচ্চমূল্যের দেশে 'ক্যাশলেস ইকোনমি' বা নগদহীন অর্থনীতি কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু ২০১৬ থেকে ২০১৯ ছিল সেই ভিত তৈরির সময়। ভারত সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ প্রচেষ্টায় সস্তায় ডেটা প্যাক এবং সুলভ স্মার্টফোন মানুষের হাতে পৌঁছাতে শুরু করল।
২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে ফোন-পে (PhonePe) বা গুগল-পে (Google Pay)-র মতো অ্যাপগুলো যখন ঘরে ঘরে পৌঁছাল, তখন বিপ্লবের প্রথম স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়। মানুষ বুঝতে শুরু করল, পকেটে মানিব্যাগ না থাকলেও কেবল একটি ফোন থাকলেই দিন কাবার করা সম্ভব।
ইউপিআই-এর ইতিহাসে সবথেকে বড় মোড় আসে ২০২০ সালে। কোভিড-১৯ অতিমারি যখন বিশ্বকে ঘরবন্দি করল, তখন 'স্পর্শহীন' বা কন্টাক্টলেস লেনদেন হয়ে উঠল অপরিহার্য। জীবাণু ছড়ানোর ভয়ে মানুষ কাগজের নোটের বদলে ফোনের কিউআর (QR) কোড স্ক্যান করতে শুরু করল। সেই সময় থেকেই ভারতের গ্রামগঞ্জেও থিতু হতে শুরু করে এই প্রযুক্তি। সবজি বিক্রেতা থেকে শুরু করে গঙ্গার ঘাটের মাঝি—সবার হাতে ঝুলে থাকা ছোট কিউআর কোড কার্ডটি হয়ে উঠল আধুনিক ভারতের প্রতীক।
২০১৬ সালে যেখানে ইউপিআই লেনদেনের সংখ্যা ছিল নগণ্য, ২০২৪-২৫ সালে তা প্রতি মাসে প্রায় ১২০০ থেকে ১৩০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাসে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এই মাধ্যমে। আজ ভারত বিশ্বের রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্টের প্রায় ৪৬-৪৮ শতাংশ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। চীন বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোও আজ ভারতের এই 'রিয়েল-টাইম' সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার গতি দেখে বিস্মিত।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ইউপিআই আর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ সম্পদ নয়। এটি এখন ভারতের এক শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্র বা 'সফট পাওয়ার'। মোদী সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়া মিশনের হাত ধরে আইফেল টাওয়ারের টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুরের শপিং মল—সবখানে ভারতের এই প্রযুক্তি সাদরে গৃহীত হয়েছে। নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মরিশাস এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলো এখন ভারতের ইউপিআই নেটওয়ার্কের সাথে সরাসরি যুক্ত। এটি কেবল পর্যটকদের সুবিধাই দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ভারতের রুপে (RuPay) কার্ড ও ইউপিআই-কে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
কেন ভারত এই অসাধ্য সাধন করতে পারল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইউপিআই-এর সহজলভ্যতায় যেগুলো শূন্য খরচ,নিরাপত্তা,ভয়েস পেমেন্ট ও অফলাইন মোড।
এখানেও সাইবার জালিয়াতি রোধ এখন প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ। তবে AI ভিত্তিক ফ্রড ডিটেকশন ব্যবস্থায় পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত।
গত ১০ বছর ছিল ভারতের সাহসের দশক। ২০১৬-র সেই ডিজিটাল অঙ্কুর আজ ২০২৬-এ এসে এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া এখন কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি একটি সামাজিক বিপ্লব।