ভোট-বিপ্লবে নতুন বাংলাদেশ: নিরঙ্কুশ জয়ের পথে বিএনপি, অস্তিত্ব সংকটে আওয়ামী লীগ
নিজস্ব প্রতিবেদন ,নিউজ ইন্ডিয়া : গতকাল, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ — এক ঐতিহাসিক গণভোট ও সাধারণ নির্বাচনের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ এখন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে।
আজ, ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ‘নৌকা’ যুগের অবসান ঘটিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে হাত দেয়।
২০২৫ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ফলে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। বাংলাদেশের পাঁচ দশকের ইতিহাসে এটিই প্রথম নির্বাচন যেখানে ‘নৌকা’ প্রতীকের কোনো উপস্থিতি নেই। বর্তমানে শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করছেন , আর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই কারাগারে অথবা আত্মগোপনে। এই রাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণ করেছে —বিএনপি,জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক শক্তি ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’।
নির্বাচন কমিশনের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ফলাফল পাওয়া আসনগুলোর চিত্র —বিএনপি ও জোট: ১৬৫টির বেশি আসনে জয়ী বা এগিয়ে । (সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১) জামায়াতে ইসলামী (১১ দলীয় জোট): ৭৫টি আসনে শক্ত অবস্থান। জাতীয় নাগরিক কমিটি: ৩৫টি আসনে জয়ী। স্বতন্ত্র ও অন্যান্য: ২৪টি আসনে জয়ী । ভোটের হার ৫ শতাংশের বেশি ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন, যা গত তিন দশকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ।
নির্বাচন মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিচ্ছিন্ন হিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৯ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত। লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, চাটখিল হিংসার খবর পাওয়া গেছে। কুমিল্লার একটি কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়। এছাড়াও কিছু জায়গায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ গ্রুপের মধ্যেও সংঘর্ষের অভিযোগ উঠেছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবির দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
নির্বাচনের পাশাপাশি দেশের সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৬৯% ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন।
ড. ইউনূস সরকারের ‘জুলাই চার্টার’ এর ফলে — দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকরা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন —বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইইউ পর্যবেক্ষক প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন "ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক সংকেত।"
তবে কিছু জায়গায় গোলযোগ ও অনলাইন প্রোপাগান্ডা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এক নজরে বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট
সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের অবস্থা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণহীন । ড. ইউনূস এখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতিতে । ভারতের অবস্থান নতুন বাস্তবতায় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত।
২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয় বরং এটি এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা।
তবে নির্বাচনের দিনের সহিংসতা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে —রাজনৈতিক সহনশীলতা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

