বন্দি বিনিময় হলেও শান্তি অধরাই: রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে অচলাবস্থারই পুনরাবৃত্তি
![]() |
| ছবি সৌজন্যে: আল জাজিরা |
নিজস্ব প্রতিবেদন, নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: যুদ্ধ থামানোর আশায় ফের বসেছিল আলোচনার টেবিল। মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতা, আশাবাদের বিবৃতি—সবই ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান এখনও বহু দূরের পথ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনার দ্বিতীয় দিন শেষ হলেও যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে কোনও বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।
১৫৭ জন করে যুদ্ধবন্দী বিনিময় নিঃসন্দেহে মানবিক দিক থেকে স্বস্তির মুহূর্ত। দীর্ঘ বন্দিদশা থেকে মুক্ত মানুষের মুখে হাসি যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার মাঝেও মানবিকতার ঝলক দেখায়। কিন্তু এই সাফল্যকে শান্তির পথে বড় কোনও অগ্রগতি হিসেবে দেখালে বাস্তবতা আড়াল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
কারণ যুদ্ধের মূল প্রশ্নগুলো আজও অনড়। ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ, সার্বভৌমত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা—এই মৌলিক বিষয়গুলিতে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। রাশিয়া-র দাবি, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক অঞ্চলের একটি বড় অংশ ছাড়তে হবে। অন্যদিকে ইউক্রেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই দাবি মানার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।
এই পারস্পরিক অনড় অবস্থানই শান্তি আলোচনাকে বারবার একই জায়গায় ফিরিয়ে আনছে। আলোচনার ভাষা যতই সংযত হোক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। মার্কিন বিশেষ দূতের বক্তব্যে কূটনৈতিক আশাবাদের সুর শোনা গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রে তার কোনও তাৎক্ষণিক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বরং আলোচনার মধ্যেই চলেছে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় আঘাত এবং জনবহুল এলাকায় হামলার অভিযোগ। যুদ্ধ থামেনি—এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিদিন।
এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি-র মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। “আমরা দ্রুত ফল চাই”—এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি, ক্ষয়ক্ষতি এবং অনিশ্চয়তার আর্তনাদ। হাজার হাজার নিহত সেনা, অসংখ্য নিখোঁজ মানুষ এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহর—সব মিলিয়ে এই যুদ্ধ আজ শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতার নয়, এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
ইউরোপীয় দেশগুলির ভূমিকা নিয়ে রাশিয়ার অভিযোগ এবং পশ্চিমা শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতভেদ শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে ইউক্রেন যেন এখনও একটি সক্রিয় ঘুঁটি—যার উপর দিয়ে চাল দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু যার ক্ষত সারানোর দায় কেউই সম্পূর্ণভাবে নিতে চাইছে না।
বন্দি বিনিময় প্রমাণ করে, চাইলে মানবিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু শান্তি কেবল মানবিক উদ্যোগে আসে না। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহস, বাস্তবসম্মত আপস এবং সর্বোপরি যুদ্ধ বন্ধের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার ছাড়া আলোচনার টেবিল যতই সাজানো হোক, যুদ্ধ থামবে না। বন্দি বিনিময় তখন থেকে যাবে সাময়িক স্বস্তির একটি অধ্যায় হিসেবেই—স্থায়ী শান্তির প্রতিশ্রুতি ছাড়া।

