মহীনের ঘোড়াগুলি: যে ব্যান্ড বাংলা রকের ইতিহাসটাই বদলে দিয়েছিল
নিজস্ব প্রতিবেদন ,নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে, যখন বাংলা আধুনিক গান মানেই ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কিংবা শ্যামল মিত্রের মেলোডি—ঠিক সেই সময় কলকাতার রাস্তায় একদল তরুণ হাতে গিটার, স্যাক্সোফোন আর ড্রামস নিয়ে হাজির হলেন এক নতুন সুরের ভাষা নিয়ে।
সেই ভাষা ছিল না পুরোপুরি পাশ্চাত্য রক, না ছিল লোকগানের প্রচলিত ধারার অনুকরণ। বরং ছিল শহুরে জীবন, কবিতা, প্রতিবাদ আর এক নতুন আত্মসচেতনতার মিশ্রণ। জন্ম হলো ভারতবর্ষের প্রথম স্বীকৃত বাংলা রক ব্যান্ড—‘মহীনের ঘোড়াগুলি’।
১৯৭৫ সালে ব্যান্ডটির যাত্রা শুরু। নেতৃত্বে ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাধর গৌতম চট্টোপাধ্যায়—যাঁকে ভক্তরা ডাকতেন ‘মণিদা’ নামে। তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতার পংক্তি—“মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে” থেকেই ব্যান্ডের নামকরণ করে। শুরুর সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রঞ্জন ঘোষাল, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, বিশু চট্টোপাধ্যায়, তাপস দাস, আব্রাহাম মজুমদার ও তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সময় রিহার্সালের শব্দে বিরক্ত প্রতিবেশীরা বাড়ির দেওয়ালে লিখে দিয়েছিল—“আস্তাবল”। কিন্তু সেই ‘আস্তাবল’ থেকেই বাংলা রকের জন্ম।
১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক’। এই গানগুলোর লিরিক্সে উঠে আসে—নাগরিক একাকিত্ব,রাজনৈতিক অস্থিরতা,স্বাধীনতার সংকট,মধ্যবিত্ত জীবনের ভাঙন কিন্তু সময় তখন প্রস্তুত ছিল না। বাণিজ্যিক সাফল্য মেলেনি। ১৯৮১ সালে ব্যান্ড ভেঙে যায়।
আবার বছর কুড়ি পরে , মহীনের প্রকৃত পুনর্জন্ম ঘটে ১৯৯৫ সালে। গৌতম চট্টোপাধ্যায় তরুণ শিল্পীদের নিয়ে প্রকাশ করেন "আবার বছর কুড়ি পরে"। এই অ্যালবামের পরই বদলে যায় ইতিহাস। তরুণ প্রজন্ম হঠাৎ আবিষ্কার করে তাদের নিজের ভাষা।
যে গানগুলো আজও অমর "পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে"(পরবর্তীতে বলিউডে “ভিগি ভিগি” গানে ব্যবহৃত সুর)," তোমায় দিলাম" ভালোবাসার নীরব অভিমান, " টেলিফোন " শহুরে বিরহের চিরন্তন সুর ।
১৯৯৯ সালে গৌতম চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হলেও তাঁর সৃষ্টি আজও অমর।বাংলা ‘জীবনমুখী’ গানের ভিত তৈরি করেন তিনিই। এরপর কবীর সুমন, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা—পরবর্তী প্রজন্মের ব্যান্ড ফসিলস, ক্যাকটাস, চন্দ্রবিন্দু সবাই আজ কোনো না কোনোভাবে মহীনের উত্তরাধিকার বহন করে।
মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খাচ্ছে না। তারা আজও দৌড়চ্ছে,বাংলা সংগীতের আকাশ জুড়ে।

