দিল্লি মেট্রোতে পাকিস্তানপন্থী পোস্টার থেকে জঙ্গি চক্রের হদিস — কলকাতা থেকে মালদহের উমর ফারুক গ্রেফতার, তামিলনাড়ুতে ধরা ৭ বাংলাদেশি

NEWS INDIA বাংলা
0
Delhi Metro Poster Terror Investigation India
প্রতিকী ছবি 

 নিজস্ব প্রতিবেদন ,নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খোদ দেশের রাজধানীর হৃদপিণ্ডে নাশকতার ছক কষেছিল এক গভীর ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী। গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দিল্লির হাই-প্রোফাইল জনপথ মেট্রো স্টেশনে আচমকা কিছু পোস্টার উদ্ধারকে কেন্দ্র করে যে রহস্যের দানা বেঁধেছিল, তিন সপ্তাহের রুদ্ধশ্বাস তদন্তের পর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল তার যবনিকা টানল। উন্মোচিত হলো এক ভয়ঙ্কর আন্তঃদেশীয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক, যার শিকড় ছড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সুদূর তামিলনাড়ু পর্যন্ত।

তদন্তকারীদের মতে, ২ ফেব্রুয়ারি দিল্লির জনপথ এবং পরবর্তীতে কাশ্মীর গেট মেট্রো স্টেশনে "India Stop Genocide" এবং "Free Kashmir" লেখা পোস্টার লাগানো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি 'ড্রাই রান' বা নিরাপত্তা মহড়া। বুরহান ওয়ানির ছবি সম্বলিত এই পোস্টারগুলো লাগিয়ে জঙ্গিরা দেখতে চেয়েছিল দিল্লির জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি এবং সিআইএসএফ (CISF)-এর নজরদারি এড়িয়ে তারা কতটা সাবলীলভাবে কাজ করতে পারে।

দিল্লি পুলিশ সূত্রে খবর, "পোস্টার লাগানোটা ছিল তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পরীক্ষা। যদি তারা এতে সফল হয়, তবে পরবর্তীতে বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।"

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং দিল্লি পুলিশ যৌথভাবে তদন্তে নামে। শত শত সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুই সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করা হয়। প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জানা যায়, তারা দিল্লি থেকে পালিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছে।

গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে কলকাতা পুলিশের সহায়তায় দিল্লির স্পেশাল সেল উত্তর ২৪ পরগনার হাতিয়ারা এলাকার মাঝেরপাড়ায় একটি ভাড়াবাড়িতে হানা দেয়। সেখান থেকেই গ্রেফতার করা হয় এই মডিউলের মূল পাণ্ডা উমর ফারুককে (৩১)। উমরের আদি বাড়ি মালদহ জেলায়। তার সঙ্গেই ধরা পড়ে বাংলাদেশি নাগরিক রবিউল ইসলাম। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় একাধিক ভুয়া আধার কার্ড, পাকিস্তানি সিম কার্ড এবং এনক্রিপ্টেড চ্যাট সমৃদ্ধ স্মার্টফোন।

উমর ফারুককে জেরা করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, এই মডিউলের বাকি সদস্যরা দক্ষিণ ভারতে গা ঢাকা দিয়ে আছে। গত সপ্তাহে তামিলনাড়ুর তিরুপ্পুরে একটি ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে আরও ৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। এরা হলেন— মিজানুর রহমান, সেফায়েত হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, লিটন, উজ্জ্বল এবং উমর (অন্যজন)।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে তিরুপ্পুরের একটি নামী পোশাক কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিল। তাদের কাছে থাকা আধার কার্ডগুলো এতই নিখুঁত ছিল যে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে তাদের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করা সম্ভব ছিল না। গোয়েন্দাসূত্রে জানাযায়, এই আটজন মিলে ভারতে একটি সুসংগঠিত 'স্লিপার সেল' তৈরি করেছিল।

তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর নাম— শাব্বির আহমেদ লোন। লোন মূলত কাশ্মীরের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের মাটিকে ব্যবহার করে এই মডিউলটি পরিচালনা করছিলেন। গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা যায়, লোন লস্কর-ই-তৈবা (LeT) বা আল-বদরের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকতে পারেন।

উমর ফারুক ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকেই লোনের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি উমর ও রবিউল কলকাতা থেকে পাটনা হয়ে দিল্লি পৌঁছান এবং ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে দিল্লির ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার লাগিয়ে সেই ভিডিও সরাসরি বাংলাদেশে পাঠান। এই কাজের বিনিময়ে তাদের অ্যাকাউন্টে বিদেশি উৎস থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল বলেও প্রমাণ পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা NIA।

 ১০টি হাই-এন্ড স্মার্টফোন যাতে 'সিগন্যাল' ও 'টেলিগ্রাম' অ্যাপের মাধ্যমে সংকেত আদান-প্রদান করা হতো। দিল্লি মেট্রোর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট এবং পার্লামেন্ট স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকার বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ তাদের ফোনে পাওয়া গেছে। উমর ফারুক স্থানীয়ভাবে ছোট অস্ত্র (Small Arms) সংগ্রহের জন্য বিহারের মুঙ্গেরের একটি চক্রের সাথে যোগাযোগ করছিল বলে সন্দেহ করছে তন্ত্রকারী আধিকারিকেরা।

বর্তমানে ধৃত আটজনকে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টে পেশ করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। NIA মামলার প্রতিটি নথিপত্র খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের প্রধান লক্ষ্য এখন উমর ফারুকের আর্থিক উৎস খুঁজে বের করা এবং এই মডিউলের সাথে আর কোনো ভারতীয় নাগরিক যুক্ত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মডিউলটি সময়মতো ধরা না পড়লে ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে বড় কোনো প্রাণঘাতী হামলার সম্ভাবনা ছিল। মালদহ থেকে তিরুপ্পুর—এই দীর্ঘ ভৌগোলিক রুটে যেভাবে জঙ্গিরা নিজেদের জাল বিস্তার করেছিল, তা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!