জমি আন্দোলন থেকে শিল্পনীতি—সিঙ্গুরে সভা করে বিজেপিকে কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
নিজস্ব সংবাদদাতা, নিউজ ইন্ডিয়া :- মাঝে কেটে গিয়েছে অনেকগুলি বছর। সেদিনের সেই ঐতিহাসিক জমি আন্দোলন এবং তৎকালীন বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। শিল্পের নামে ‘গায়ের জোরে’ নেওয়া জমি আদালতের নির্দেশে ফেরত পেয়েছেন সিঙ্গুরের কৃষকরা। সময় অনেকটা এগোলেও আন্দোলনের স্মৃতি এবং তার রাজনৈতিক তাৎপর্য আজও অমলিন। বুধবার সিঙ্গুরে জনসভা করতে এসে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন—সেদিনের রাজনীতি তাঁর ভুল ছিল না, আর আজও তিনি কোনও আপসের পথে হাঁটবেন না।
যে সিঙ্গুর আন্দোলন এক সময় গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছিল এবং বামফ্রন্ট সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই আন্দোলনের স্মৃতিকে সামনে রেখেই ইন্দ্রখালি এলাকায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সিঙ্গুর আন্দোলন একটি ‘বড় আন্দোলন’ হিসেবেই স্মরণীয়। কৃষিজমি ফেরতের দাবিতে তাঁর টানা ২৬ দিনের অনশন এবং সেই সময় সিঙ্গুরবাসীর সহযোগিতার কথা স্মরণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “২৬ দিন অনশন করেছি। রাস্তায় পড়ে থেকেছি। এখানকার মানুষ তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের খাবার দিয়েছেন।”
জমি আন্দোলনের শহিদ তাপসী মালিকের নাম উল্লেখ করে সিঙ্গুরবাসীর উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারাই আমার চেতনা, আপনারাই আমার অনুপ্রেরণা।” তাঁর সংযোজন, “সিঙ্গুরের জন্য আমি মরতে প্রস্তুত ছিলাম।”
এদিনের বক্তব্যে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। ১০০ দিনের কাজ-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে ধরার পাশাপাশি এসআইআর ইস্যুতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথাও বারবার উল্লেখ করেন তিনি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে এসআইআর নিয়ে নিজের লেখা কবিতা পাঠ করার পাশাপাশি, এসআইআর সংক্রান্ত সমস্যার জেরে মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে—এমন ব্যক্তিদের প্রতি শোকপ্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি মানুষকে ভয় না পেয়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার আহ্বান জানান এবং বলেন, “একদিন তো দিল্লি যাবই। প্রয়োজনে আদালতে সওয়াল করব।”
বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলায় কথা বললে মারছেন, আর বলছেন বাংলা দখল করবেন!” বিজেপির উদ্দেশে তাঁর কড়া বার্তা, “আমাকে রোখার সাধ্য আপনাদের নেই।”
উল্লেখ্য, কয়েকদিন আগেই সিঙ্গুরে সভা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শিল্প ও ন্যানো কারখানা প্রসঙ্গও উঠে এসেছে সেই সভায়। তবে এদিন সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন, তিনি কৃষি ও শিল্প—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। তাঁর কথায়, “কৃষি এবং শিল্প দুই চলবে।” তিনি জানান, সিঙ্গুরে অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি বেসরকারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরির কাজও এগিয়ে চলেছে।
বাম আমলে অভিযোগ উঠেছিল, কৃষিজমি গায়ের জোরে কেড়ে নিয়ে শিল্প স্থাপনের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু এদিনের বক্তব্যে ফের একবার মুখ্যমন্ত্রী বুঝিয়ে দেন—শিল্পের নামে কৃষকের জমি কেড়ে নেওয়ার রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী নন।
এই সভা মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। জানান, সেচ ও জলপথ দফতর এই প্রকল্প কার্যকর করবে। পাশাপাশি ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের কিস্তির টাকা প্রদান-সহ একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সূচনা করেন তিনি। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন ঘাটালের সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব)। এছাড়াও আনন্দপুর এলাকায় মৃতদের পরিবারের একজনকে সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ পুলিশকে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।


