আজকের দ্রুতগতির জীবনে মানুষ যেন সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে। কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং নানান শারীরিক সমস্যার মাঝে অনেকেই খুঁজছেন সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের পথ। আর সেই পথের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে যোগব্যায়াম ও ধ্যান। শুধুমাত্র শরীরচর্চা নয়, মন ও শরীরের মধ্যে ভারসাম্য গড়ে তোলার এক প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি হিসেবে যোগ আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
প্রতি বছর ২১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। ২০২৬ সালেও তার ব্যতিক্রম নয়। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিন উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে গণযোগাভ্যাস, স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি, ধ্যান শিবির এবং সুস্থ জীবনধারার প্রচারমূলক নানা অনুষ্ঠান।
২০২৬ সালের যোগ দিবসের থিম কী?
এবারের আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যকর বার্ধক্যের জন্য যোগ’ (Yoga for Healthy Ageing)। এই বার্তার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে যে যোগ কেবল তরুণদের জন্য নয়; বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুস্থতা, কর্মক্ষমতা, মানসিক স্থিতি এবং আত্মনির্ভরশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত যোগাভ্যাস শরীরের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মানসিক চাপ কমায় এবং বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। ফলে সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য যোগ আজ সব বয়সের মানুষের কাছেই সমান প্রাসঙ্গিক।
কীভাবে শুরু হয়েছিল আন্তর্জাতিক যোগ দিবস?
আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়, তবে এর পেছনে রয়েছে ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ঘোষণার প্রস্তাব দেন।
তার এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমর্থন পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই রেকর্ড সংখ্যক দেশ সেই প্রস্তাবকে সমর্থন জানায় এবং জাতিসংঘ ২১ জুনকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ২০১৫ সালের ২১ জুন প্রথমবারের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একযোগে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালন করা হয়।
কেন ২১ জুন তারিখটি বেছে নেওয়া হয়েছিল?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, যোগ দিবস পালনের জন্য ২১ জুনকেই কেন বেছে নেওয়া হলো?
এর পেছনে রয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক তাৎপর্য। উত্তর গোলার্ধে ২১ জুন বছরের দীর্ঘতম দিন বা গ্রীষ্মকালীন অয়নকাল (Summer Solstice)। ভারতীয় যোগ দর্শনে এই সময়কে আত্মঅনুসন্ধান, আধ্যাত্মিক বিকাশ এবং জীবনের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক যোগ দিবস পালনের জন্য এই দিনটিকে নির্বাচন করা হয়েছিল।
কলকাতায় বিশেষ আয়োজন, থাকছেন প্রধানমন্ত্রী
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। এবার কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডকে কেন্দ্র করে বৃহৎ পরিসরে যোগ দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সূত্রের খবর, ২১ জুন সকালে কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে তিনি ‘কমন যোগ প্রোটোকল’ সেশনে অংশগ্রহণ করবেন। একসঙ্গে যোগাভ্যাসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সুস্থ জীবনধারার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এই অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক যোগ?
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনে মানুষ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মানসিক চাপ ও শারীরিক সমস্যার প্রকোপ। এই পরিস্থিতিতে যোগ শুধুমাত্র একটি ব্যায়াম পদ্ধতি নয়, বরং একটি জীবনদর্শন হিসেবেও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। নিয়মিত যোগাভ্যাস মানুষকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পথও দেখায়।
তাই আন্তর্জাতিক যোগ দিবস শুধু একটি বিশেষ দিন নয়; এটি সুস্থ, সচেতন ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের প্রতি বিশ্ববাসীর এক সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতীক।

