শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ, ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যে বড় সমঝোতা
নিজস্ব প্রতিবেদন, নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি হলো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে চলেছে। শুল্ক হ্রাস, জ্বালানি সহযোগিতা এবং ৫০০ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য লক্ষ্যে এগোনোর ঘোষণা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও ভূ-রাজনীতির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও দু’দেশ ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলি সেই সম্পর্ককে একটি কাঠামোগত ও দীর্ঘমেয়াদি স্তরে নিয়ে যাচ্ছে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
এই ফোনালাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দু’দেশের সমঝোতা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক (Reciprocal Tariff) ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে। পাশাপাশি ভারতও ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর থাকা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা (Tariff ও Non-Tariff Barriers) কমানোর পথে এগোবে বলে জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশ অনেক সহজ হবে। টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা—একাধিক ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও মজবুত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্ক হ্রাস শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে না, বরং দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক টানাপোড়েনেও স্বস্তি আনবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে অবস্থান বদলাতে সম্মত হয়েছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারত ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং সম্ভাব্যভাবে ভেনেজুয়েলা থেকেও বেশি পরিমাণে জ্বালানি আমদানি করবে।
এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়ে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মুখে ছিল। নতুন এই অবস্থান পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতাকেই স্পষ্ট করছে বলে মত কূটনীতিক মহলের।
ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও জানান, ‘BUY AMERICAN’ নীতির আওতায় ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি, কয়লা ও বিভিন্ন শিল্প সামগ্রী। মোট বাণিজ্যের অঙ্ক ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে তা ভারত–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ইতিহাসে নজিরবিহীন অধ্যায় হয়ে উঠবে। বর্তমানে দু’দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলার। নতুন এই সমঝোতা সেই অঙ্ককে কয়েক গুণ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নামায় ভারতীয় পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে। মোদি জানান, ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, বিশ্বের দুটি বৃহৎ গণতন্ত্র একসঙ্গে কাজ করলে তার সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নতুন শিল্প স্থাপন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই সমঝোতা বড় ভূমিকা নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর এই সমঝোতাকে “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মাইলস্টোন” বলে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, এই বাণিজ্য চুক্তি কর্মসংস্থান বাড়াবে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতি দেবে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেন, শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নামায় ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও এই দিনটিকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য “বড় দিন” বলে আখ্যা দেন।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশিত এক প্রেস রিলিজে US-India Strategic Partnership Forum (USISPF) এই সিদ্ধান্তকে “ইতিবাচক প্রথম পদক্ষেপ” হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থার মতে, শুল্ক হ্রাস একটি বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।
তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আগামী মাসগুলিতে আরও দফায় আলোচনা হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আলোচনা সফল হলে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী হবে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়বে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প–মোদি ফোনালাপ, শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা এবং ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্যের কথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র শুধু কৌশলগত অংশীদার নয়, বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকেও দৃঢ়ভাবে এগোচ্ছে।
এই সমঝোতা কতটা দ্রুত বাস্তব রূপ পায়, সেটাই এখন দেখার। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট—ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন এক উচ্চতার পথে।

