জুল রিমে থেকে বর্তমান ট্রফি—ফুটবল গৌরবের সম্পূর্ণ কাহিনি

NEWS INDIA বাংলা
0

 ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস মানেই শুধু ম্যাচ, গোল বা শিরোপা জয় নয়—এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একটি ট্রফির গল্প, যা যুগে যুগে ফুটবল বিশ্বের গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বকাপ ট্রফি কেবল সোনা বা ধাতুর তৈরি একটি বস্তু নয়; এটি লাখো ফুটবলারের স্বপ্ন, কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ এবং একটি দেশের জাতীয় গর্বের প্রতিচ্ছবি।

জুল রিমে ট্রফির জন্ম : বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুরু হয় ১৯৩০ সালে প্রথম FIFA World Cup আয়োজনের সঙ্গে। সেই সময় ট্রফিটির নাম ছিল ‘ভিক্টরি’। পরে বিশ্বকাপের রূপকার ও তৎকালীন FIFA সভাপতি Jules Rimet–এর সম্মানে এর নামকরণ করা হয় ‘জুল রিমে ট্রফি’। এই ট্রফিটি তৈরি হয়েছিল সোনায় মোড়ানো রুপা দিয়ে, যার ওপরে ছিল ডানা মেলা দেবী নাইকের অবয়ব—যিনি বিজয়ের প্রতীক। উচ্চতায় প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার ও ওজনে প্রায় ৩.৮ কিলোগ্রামের এই ট্রফি দ্রুতই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কারে পরিণত হয়।

যুদ্ধ ও চুরির নাটকীয় অধ্যায় : জুল রিমে ট্রফির ইতিহাসে রয়েছে রোমাঞ্চকর অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি নাৎসি জার্মানির হাত থেকে রক্ষা করতে ইতালির এক ফুটবল কর্মকর্তা এটি গোপনে একটি জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখেন। যুদ্ধশেষে ট্রফি আবার নিরাপদে FIFA-এর কাছে ফিরে আসে। সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগে। লন্ডনে প্রদর্শনের সময় জুল রিমে ট্রফি চুরি হয়ে যায়, যা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। পরে ‘পিকলস’ নামের এক কুকুরের সাহায্যে ট্রফিটি উদ্ধার হয়। এই ঘটনা ট্রফির ইতিহাসকে আরও কিংবদন্তিময় করে তোলে।

ব্রাজিলের স্থায়ী মালিকানা : FIFA-এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যদি তিনবার বিশ্বকাপ জেতে, তবে তারা জুল রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিকানা পাবে। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০—এই তিনটি বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল সেই কৃতিত্ব অর্জন করে। এর ফলে ১৯৭০ সালের পর জুল রিমে ট্রফি স্থায়ীভাবে ব্রাজিলের কাছে থেকে যায়। তবে দুঃখজনকভাবে, পরবর্তীকালে এই ঐতিহাসিক ট্রফিটি ব্রাজিলেই চুরি হয়ে যায় এবং আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে ধারণা করা হয়।

নতুন ট্রফির সূচনা : জুল রিমে ট্রফি অবসরের পর FIFA নতুন একটি ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে ব্যবহৃত বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফিটি তৈরি করেন ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগা। ১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরি এই ট্রফির ওজন প্রায় ৬.১ কিলোগ্রাম এবং উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার। এর নকশায় দেখা যায়—দুই মানব অবয়ব পৃথিবীকে তুলে ধরেছে, যা বিশ্বব্যাপী ফুটবলের ঐক্য ও গৌরবের প্রতীক।

বর্তমান ট্রফির নিয়ম ও মর্যাদা : বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ এই ট্রফির স্থায়ী মালিক হতে পারে না। বিশ্বকাপজয়ী দল ট্রফিটি অল্প সময়ের জন্য ধরে রাখার সুযোগ পায় এবং পরে FIFA-এর কাছে ফিরিয়ে দেয়। বিজয়ী দেশকে একটি সোনালি প্রতিরূপ দেওয়া হয়, যা তারা নিজেদের কাছে রাখতে পারে।

গৌরবের প্রতীক হিসেবে ট্রফি : বিশ্বকাপ ট্রফি আজ শুধু একটি ক্রীড়া পুরস্কার নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আবেগের প্রতীক। প্রতিটি বিশ্বকাপের সঙ্গে ট্রফিকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন গল্প, নতুন স্বপ্ন ও নতুন কিংবদন্তি।

জুল রিমে ট্রফি থেকে শুরু করে বর্তমান সোনালি বিশ্বকাপ ট্রফি—এই দীর্ঘ পথচলা ফুটবল ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। সময় বদলেছে, নকশা বদলেছে, কিন্তু ট্রফির গুরুত্ব একটুও কমেনি। বিশ্বকাপ ট্রফি আজও কোটি কোটি ফুটবলারের চূড়ান্ত স্বপ্ন এবং কোটি কোটি সমর্থকের গর্বের প্রতীক হয়ে রয়ে গেছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!