নিউজ ইন্ডিয়া, স্পর্টস ডেস্ক : বিশ্ব ক্রিকেট আজ শুধু একটি খেলা নয়,এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, জাতীয় গর্ব এবং বিশাল ক্রীড়া অর্থনীতির অংশ। ইংল্যান্ডের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু হয়ে ক্রিকেট আজ ভারত, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জসহ বহু দেশে ধর্মের মতো অনুসৃত হয়। কিন্তু এই জনপ্রিয় খেলাটির পথচলা ছিল দীর্ঘ, ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ ইতিহাস।
ইতিহাসবিদদের মতে, ক্রিকেটের জন্ম ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে ইংল্যান্ডে। প্রথম দিকে এটি ছিল শিশু ও গ্রামবাসীদের খেলা। ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের অভিজাত সমাজের মধ্যেও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে ক্রিকেট। ১৭৪৪ সালে ক্রিকেটের প্রথম লিখিত নিয়ম প্রণীত হয়, যা খেলাটিকে একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ দেয়। এরপর ১৭৮৭ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয় মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (MCC), যারা ক্রিকেটের নিয়ম সংরক্ষণ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ১৮৪৪ সালে, যখন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তবে আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটের সূচনা হয় ১৮৭৭ সালে, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে খেলা প্রথম টেস্ট ম্যাচের মাধ্যমে। এই ম্যাচ থেকেই টেস্ট ক্রিকেট বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ মানের প্রতিযোগিতা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বিশ্ব ক্রিকেটকে সংগঠিত করার জন্য ১৯০৯ সালে গঠিত হয় International Cricket Council (ICC)। প্রথমে এটি ইম্পেরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স নামে পরিচিত ছিল। ICC-এর হাত ধরেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ম, টুর্নামেন্ট ও সম্প্রসারণ বিশ্বব্যাপী সুসংহত হয়।
ক্রিকেট ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী অধ্যায় শুরু হয় ১৯৭৫ সালে, যখন ইংল্যান্ডে প্রথম Cricket World Cup অনুষ্ঠিত হয়। ওয়ানডে ফরম্যাটে খেলা এই টুর্নামেন্ট ক্রিকেটকে নতুন মাত্রা দেয়। এরপর ১৯৯২ সালে রঙিন পোশাক, ফ্লাডলাইট ও ডে-নাইট ম্যাচ চালু হওয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট আরও দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের আবির্ভাব খেলাটিকে আরও দ্রুতগতির ও বিনোদনমূলক করে তোলে।
বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাস কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের গল্প ছাড়া অসম্পূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার ডন ব্র্যাডম্যান আজও টেস্ট গড় ৯৯.৯৪ নিয়ে ক্রিকেটের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত। ভারতের সচিন তেন্ডুলকর শত আন্তর্জাতিক শতরানের মাধ্যমে কোটি ভক্তের হৃদয়ে স্থান করে নেন। পাশাপাশি স্যার গারফিল্ড সোবার্স, ইমরান খান, ব্রায়ান লারা, জ্যাক ক্যালিস ও মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো তারকারা ক্রিকেট ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। অন্যদিকে একসময় ক্রিকেট ছিল পুরুষদের আধিপত্যে থাকা একটি খেলা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের ক্রিকেট বিশ্বমঞ্চে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ১৯৭৩ সালে প্রথম মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়, যা পুরুষদের বিশ্বকাপেরও আগে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের পাশাপাশি ভারতীয় মহিলা দলও আজ বিশ্ব ক্রিকেটে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। মিতালি রাজ, এলিসা হিলি, মেগ ল্যানিং, স্মৃতি মান্ধানার মতো ক্রিকেটাররা নারী ক্রিকেটকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বর্তমানে মহিলা টি-টোয়েন্টি লিগ ও বিশ্বকাপ নারী ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়েছে।
২০০৭ সালে প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এক নতুন বিপ্লব আনে। ছোট ফরম্যাটের এই ক্রিকেট তরুণ দর্শকদের আকর্ষণ করে এবং খেলাটিকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে। এই ধারাবাহিকতার ফলেই শুরু হয় বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ—আইপিএল, বিগ ব্যাশ, পিএসএল, বিপিএল। এই লিগগুলো ক্রিকেটকে বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পে রূপান্তরিত করেছে এবং খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তা ও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে।
বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে কিছু স্টেডিয়াম নিজেই কিংবদন্তি ,লর্ডস (ইংল্যান্ড): ক্রিকেটের ‘হোম অব ক্রিকেট’ হিসেবে পরিচিত। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (অস্ট্রেলিয়া): বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ইডেন গার্ডেন্স (কলকাতা): ভারতীয় ক্রিকেটের আবেগের কেন্দ্র। ওয়াংখেড়ে (মুম্বই): ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের সাক্ষী। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন। শুধু ম্যাচ আয়োজনের স্থান নয়, বরং ক্রিকেট ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক।
বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাস প্রমাণ করে, একটি খেলা কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে। ইংল্যান্ডের মাঠ থেকে শুরু হয়ে আজ ক্রিকেট কোটি মানুষের আবেগ ও স্বপ্নের প্রতীক। নিয়ম বদলেছে, ফরম্যাট বদলেছে, খেলোয়াড় বদলেছে—কিন্তু ক্রিকেটের প্রতি মানুষের ভালোবাসা অটুট রয়েছে। ভবিষ্যতেও এই খেলা নতুন নতুন ইতিহাস গড়ে চলবে।



