নিজস্ব প্রতিবেদন ,নিউজ ইন্ডিয়া : আজকের দিনে সিনেমা মানেই মাল্টিপ্লেক্সের বিশাল পর্দা, ডলবি সাউন্ড সিস্টেম, কোটি টাকার বাজেট আর ভিএফএক্সের কারিশমা। কিন্তু এই আধুনিক বিনোদনমাধ্যমের সূচনালগ্ন ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং নিছক একটি বৈজ্ঞানিক কৌতূহল। গত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সিনেমা কেবল বিনোদন নয়, বরং বিজ্ঞান, শিল্প ও সমাজের এক যুগান্তকারী মিলনবিন্দু হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের সেই কয়েক সেকেন্ডের চলমান ছবি থেকে আজকের 'লার্জার দ্যান লাইফ' সিনেমার যাত্রা এক অভাবনীয় রূপান্তর।
স্থির ছবির গতিরূপ থেকে মোশন পিকচারের নেপথ্য বিজ্ঞান , সিনেমা বা চলচ্চিত্র আদতে একটি আলোকবৈজ্ঞানিক ভ্রম। মানুষের চোখের একটি বিশেষ সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়েই এই শিল্পের জন্ম। উনিশ শতকের শেষভাগে বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, মানুষের চোখের সামনে যদি প্রতি সেকেন্ডে ১৬ থেকে ২৪টি স্থির ছবি দ্রুত পরিবর্তন করা হয়, তবে মস্তিষ্ক সেগুলোকে আলাদা ছবি হিসেবে না দেখে একটি 'চলমান দৃশ্য' হিসেবে গ্রহণ করে। একে বলা হয় 'পারসিসটেন্স অফ ভিশন'। এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম সফল চেষ্টা করেন ব্রিটিশ আলোকচিত্রী এডওয়ার্ড মেব্রিজ (Eadweard Muybridge)। ১৮৭৮ সালে তিনি একটি দৌড়ানো ঘোড়ার গতির ওপর পরীক্ষা চালাতে গিয়ে ১২টি আলাদা ক্যামেরা ব্যবহার করেন। সেই ছবিগুলো যখন দ্রুত পর্যায়ক্রমে দেখা গেল, তখন মনে হলো ঘোড়াটি সত্যিই ছুটছে। এই পরীক্ষাই ছিল ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর।
এডিশন থেকে লুমিয়ের,প্রযুক্তির লড়াই । মেব্রিজের পর বিখ্যাত মার্কিন বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিশন ১৮৯১ সালে তৈরি করেন ‘কাইনোস্কোপ’। এটি ছিল একটি কাঠের বাক্স যার ভেতরে ছিদ্র দিয়ে একজনকে তাকিয়ে ছবি দেখতে হতো। কিন্তু সিনেমাকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব ফরাসি ভাই অগাস্ট লুমিয়ের (Auguste Lumière) এবং লুই লুমিয়েরের (Louis Lumière)। ১৮৯৫ সালে তারা উদ্ভাবন করেন ‘সিনেমাটোগ্রাফ’। এই যন্ত্রটির বিশেষত্ব ছিল—এটি দিয়ে ছবি তোলা যেত, তা প্রসেস করা যেত এবং প্রজেক্টরের মাধ্যমে পর্দায় প্রদর্শিত হতো। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্যারিসের গ্র্যান্ড ক্যাফেতে লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় প্রথমবার জনসমক্ষে ছবি প্রদর্শনী করেন। তাদের নির্মিত ‘Workers Leaving the Lumière Factory’ বা ‘The Arrival of a Train at La Ciotat’ ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ছবি। কথিত আছে, পর্দায় যখন ট্রেনটিকে স্টেশনে আসতে দেখা যায়, তখন হলের দর্শকরা ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করেছিলেন—তারা ভেবেছিলেন জীবন্ত ট্রেন বুঝি তাদের ওপর আছড়ে পড়বে। এই সাধারণ ঘটনাটিই ছিল বিশ্ব সিনেমার আনুষ্ঠানিক জন্মলগ্ন।
নীরব যুগের জাদুকর ও গল্পের উন্মেষ টা শুরুর দিকে সিনেমা ছিল কেবল প্রামাণ্যচিত্রের মতো—বাস্তব জীবনের দৃশ্য ধারণ করা। কিন্তু সিনেমাকে নিছক দৃশ্য থেকে গল্পে রূপান্তর করেন ফরাসি জাদুকর জর্জেস মেলিয়েস (Georges Méliès)। তিনি অনুভব করেছিলেন, ক্যামেরার মাধ্যমে জাদু তৈরি করা সম্ভব। ১৯০২ সালে মুক্তি পায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘A Trip to the Moon’। এই ছবিতে তিনি প্রথম ডাবল এক্সপোজার, ল্যাপ ডিজলভ এবং হাতে রঙ করার মতো কারিগরি ব্যবহার করেন। এটিই ছিল সিনেমার ইতিহাসে প্রথম সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক ছবি। ১৯১০ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় সিনেমার 'নীরব যুগ'। তখন শব্দ বা সংলাপ ছিল না, অভিনয় ও মুখভঙ্গির মাধ্যমেই সব বোঝানো হতো। প্রেক্ষাগৃহে একজন পিয়ানোবাদক লাইভ মিউজিক বাজাতেন ছবির মেজাজ বোঝাতে। এই যুগের মহানায়ক ছিলেন চার্লি চ্যাপলিন এবং বাস্টার কিটন। তাদের শারীরিক অভিনয় ও কৌতুক গোটা বিশ্বকে হাসিয়েছিল এবং নির্বাক ছবিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯২৭ সালে যখন মুক্তি পায় প্রথম সবাক ছবি (Talkie) ‘The Jazz Singer’। প্রথমবারের মতো দর্শকরা পর্দার চরিত্রের মুখ থেকে সংলাপ শুনতে পান। এরপর প্রযুক্তির গতি আর থামেনি। ১৯৩০-এর দশকে 'টেকনিকালার' প্রযুক্তির মাধ্যমে সাদা-কালো পর্দা রঙিন হয়ে ওঠে। ১৯৩৯ সালের ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ বা ‘উইজার্ড অফ অজ’ রঙিন সিনেমার জয়যাত্রা শুরু করে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মতো ভারতীয় উপমহাদেশেও সিনেমার ঢেউ খুব দ্রুত এসে পৌঁছায়। ১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে নির্মাণ করেন ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘রাজা হরিশচন্দ্র’। ঠিক একইভাবে হীরালাল সেন ও পরবর্তীকালে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে বাংলা সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। ১৯৫৬ সালে জহির রায়হানের অবদান এবং পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ বিশ্বমঞ্চে বাংলা চলচ্চিত্রকে সম্মানের আসনে বসায়।
সিনেমা কেবল রূপালি পর্দার গল্প নয়; এটি সমাজের আয়না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সিনেমাকে জনমত গঠনে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার ১৯৫০-এর দশকে ইতালীয় নিওরিয়েলিজম বা সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলোতে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও জীবনসংগ্রামের বাস্তব চিত্র। সিনেমা মানুষের পোশাকের ফ্যাশন থেকে শুরু করে কথা বলার ধরন এবং সাংস্কৃতিক চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। আজ হলিউড বা বলিউডের বিশ্বব্যাপী প্রভাব প্রমাণ করে যে, ভাষা ভিন্ন হলেও সিনেমার আবেদনের কোনো সীমানা নেই।
লুমিয়ের ভাইদের সেই ৫ সেকেন্ডের কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা শ্রমিকদের দৃশ্য আজ মার্ভেল বা অ্যাভাটারের মতো ৩-ডি ব্লকবাস্টারে রূপ নিয়েছে। ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে এখন সিনেমা মানুষের হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রযুক্তির যতই পরিবর্তন আসুক না কেন, সিনেমার মূল আত্মা আজও সেই ১৮৯৫ সালের মতোই রয়ে গেছে—মানুষকে নতুন এক জগতে নিয়ে যাওয়া এবং গল্পের মাধ্যমে আবেগের আদান-প্রদান করা। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে যখন প্রজেক্টরের আলো জ্বলে ওঠে, তখন কয়েকশ মানুষ এক হয়ে হাসি-কান্না আর রোমাঞ্চের সাগরে ভাসে—সিনেমার এই যাদু আগামী শতবর্ষেও অম্লান থাকবে।

