নিজস্ব সংবাদদাতা, নিউজ ইন্ডিয়া : ভারতের মহারাষ্ট্র রাজনীতির এক বর্ণময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। আজ সকালে পুনে জেলার বারামতির কাছে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অজিত আনন্তরাও পাওয়ার। বিমানে থাকা দুই পাইলটসহ মোট পাঁচজন এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে গোটা রাজ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
আজ সকালে মুম্বাইয়ের জুহু বিমানবন্দর থেকে একটি চার্টার্ড লিয়ারজেট 45XR (Learjet 45XR) বিমানে চড়ে বারামতির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন অজিত পাওয়ার। উদ্দেশ্য ছিল সেখানে আয়োজিত একটি বিশেষ নির্বাচনী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা। সকাল ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ বিমানটি যখন বারামতি বিমানবন্দরের আকাশসীমায় প্রবেশ করে, তখনই পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে (ATC) যান্ত্রিক গোলযোগের বার্তা পাঠান এবং জরুরি অবতরণের অনুমতি চান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিমানটি রানওয়েতে ছোঁয়ার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে হঠাৎ করে একদিকে হেলে পড়ে এবং প্রচণ্ড গতিতে পার্শ্ববর্তী একটি ফাঁকা মাঠে আছড়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী রামদাস শিণ্ডে বলেন, "আমরা বিকট শব্দ শুনতে পাই এবং দেখি বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ার সাথে সাথে আগুনের গোল্লায় পরিণত হয়। ধোঁয়ায় আকাশ কালো হয়ে গিয়েছিল।" স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেও আগুনের লেলিহান শিখার কারণে বিমানের কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিমানে থাকা কেউই বেঁচে নেই। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন: অজিত পাওয়ার: মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন আর. কে. শর্মা: প্রধান পাইলট, কো-পাইলট মণীষা ভাটিয়া,সঞ্জয় দেশমুখ: অজিত পাওয়ারের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী, বিজয় পাতিল: ফ্লাইং অ্যাটেনড্যান্ট।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ভারতের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা DGCA (Directorate General of Civil Aviation) একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি বা 'ইঞ্জিন ফেইলিওর'-এর কথা ভাবা হলেও, সঠিক কারণ জানতে বিমানের ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশন-এর এক কর্মকর্তা জানান, "এটি একটি অত্যন্ত আধুনিক লিয়ারজেট বিমান ছিল। রানওয়ের এত কাছে কেন এটি বিধ্বস্ত হলো, তা গভীর তদন্তের বিষয়। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
অজিত পাওয়ারের অকাল প্রয়াণে মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমীকরণ এক বড়সড় ধাক্কার মুখে পড়ল। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস তাঁর শোকবার্তায় বলেন, "অজিত দাদা ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক এবং সাধারণ মানুষের নেতা। তাঁর মৃত্যু আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং রাজ্যের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতা।"
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করে তাঁর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, "অজিত পাওয়ারের আকস্মিক প্রয়াণে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। মহারাষ্ট্রের উন্নয়নে তাঁর ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।" কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং এনসিপি (NCP) সুপ্রিমো শরদ পাওয়ারের পরিবারসহ সমস্ত স্তরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
অজিত পাওয়ারের নিজের নির্বাচনী এলাকা এবং জন্মভিটে বারামতিতে এখন কান্নার রোল। হাজার হাজার মানুষ বারামতি বিমানবন্দরের বাইরে এবং তাঁর বাসভবনের সামনে ভিড় করেছেন। স্থানীয় প্রশাসন পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। বাজারঘাট ও দোকানপাট স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। জানা গেছে, ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে এবং আজ বিকেলেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
অজিত পাওয়ার ছিলেন মহারাষ্ট্র রাজনীতির অন্যতম প্রধান কারিগর। বহুবার উপ-মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই নেতা প্রশাসনিক দৃঢ়তার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়, বরং গোটা রাজ্যের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।

