নিউজ ইন্ডিয়া ডেস্ক: আজ ২৩শে জানুয়ারি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের নাম—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। এই দিনটি দেশজুড়ে গভীর শ্রদ্ধা, গৌরব ও দেশপ্রেমের আবেগে পালিত হয় দেশনায়কের জন্মদিবস হিসেবে। ১৮৯৭ সালের ২৩শে জানুয়ারি ওড়িশার কটক শহরে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান বিপ্লবী নেতা, যিনি তাঁর আপসহীন আদর্শ, অসীম সাহস এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন।
![]() |
| ২৩শে জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন |
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি বিশ্বাস করতেন—ভারতের স্বাধীনতা ভিক্ষা করে পাওয়া সম্ভব নয়, বরং তা ছিনিয়ে আনতে হবে। তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বাসই তাঁকে অন্যান্য সমসাময়িক নেতাদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং ছিলেন এক সাহসী বিপ্লবী, দক্ষ সংগঠক এবং অনমনীয় দেশপ্রেমিক।
প্রথম থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে (ICS) উচ্চ স্থান অর্জন করলেও, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সেই চাকরি ত্যাগ করেন। এরপর সরাসরি যুক্ত হন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি অনুভব করেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও প্রত্যক্ষ লড়াই প্রয়োজন।
এই ভাবনা থেকেই নেতাজি বিদেশে গিয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি গঠন করেন ঐতিহাসিক আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army – INA)। তাঁর নেতৃত্বে এই বাহিনী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।
নেতাজির সেই বিখ্যাত আহ্বান—“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব” আজও ভারতবাসীর মনে রোমাঞ্চ ও অনুপ্রেরণা জাগায়।
২৩শে জানুয়ারি শুধু একটি জন্মদিন নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাহসী ইতিহাসকে স্মরণ করার দিন। এই দিনটি বর্তমানে দেশজুড়ে ‘পরাক্রম দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, সেমিনার, রক্তদান শিবির, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দেশাত্মবোধক কর্মসূচি। নেতাজির মূর্তিতে মাল্যদান, প্রভাতফেরি ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় তাঁকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতাজির আদর্শ ছড়িয়ে দিতে নানা শিক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয় এই দিনে।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মান, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম—এই চারটি মূল মূল্যবোধ নেতাজির জীবনদর্শনের ভিত্তি। আজকের তরুণ সমাজ যদি এই আদর্শকে অনুসরণ করে, তবে দেশ গঠনের পথে তা হবে এক শক্ত ভিত।
নেতাজি বারবার বলেছেন, দুর্বলতা জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। তাঁর মতে, শক্ত মনোবল ও আত্মত্যাগ ছাড়া কোনও জাতি উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। এই বার্তাই আজও আমাদের পথ দেখায়।
নেতাজির অন্তর্ধান আজও ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়। তবে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও, তাঁর আদর্শ ও চিন্তাধারা আজও ভারতীয় সমাজে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। স্বাধীন ভারতের সামরিক শক্তি, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আত্মমর্যাদার ধারণায় নেতাজির অবদান অনস্বীকার্য।
২৩শে জানুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়, এটি একটি দায়িত্ব। দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কাজ করতে হয়, কীভাবে ভয়কে জয় করে এগিয়ে যেতে হয়।
আজকের দিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় হল—তাঁর আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়িত করা। দেশপ্রেম, সততা ও সাহসকে পাথেয় করেই আগামীর ভারত গড়ে উঠুক—এই হোক ২৩শে জানুয়ারির প্রকৃত শিক্ষা।

